মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

বর্ধমানের অজানা সাতকাহন: 'চালের গোলা' থেকে ১০৮ মন্দিরের বিস্ময়কর রহস্য

 

বর্ধমানের অজানা সাতকাহন: 'চালের গোলা' থেকে ১০৮ মন্দিরের বিস্ময়কর রহস্য





১. ভূমিকা

পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে বর্ধমান মানেই কেবল মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সোনালী ধানক্ষেত নয়, বরং এটি এক সুগভীর ইতিহাসের দর্পণ। দামোদর নদের পলিমাটিতে সমৃদ্ধ এই 'বাংলার চালের গোলা'র উর্বরতা যেমন প্রবাদপ্রতিম, তেমনই এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে রাজকীয় আভিজাত্য এবং আধ্যাত্মিক সুষমা। দামোদরের দান এই উর্বর ভূমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ, যা কালক্রমে হয়ে ওঠে সংস্কৃতির পীঠস্থান। কেবল সবুজ প্রকৃতির শান্ত শীতলতা নয়, বর্ধমানের অলিগলিতে কান পাতলে আজও শোনা যায় অজানা সব 'সাতকাহন'—যেখানে প্রাচীন স্থাপত্যের গাম্ভীর্য আর রসনার রাজকীয় তৃপ্তি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

২. একই ছন্দে ১০৮: জ্যামিতিক ভক্তির এক অনন্য স্থাপত্য

বর্ধমান শহরের উপকণ্ঠে নবাবহাটে অবস্থিত ১০৮ শিব মন্দির কেবল একটি তীর্থস্থান নয়, এটি আঠারো শতকের জ্যামিতিক স্থাপত্যের এক বিরল নিদর্শন। ১৭৯০ সালে বর্ধমানের মহারানি বিষ্ণু কুমারী এই মন্দির চত্বরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। তবে এই নির্মাণের পিছনে ছিল এক বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট; মূলত বর্গি বা মারাঠা আক্রমণকারীদের হাত থেকে রাজ্যকে রক্ষা করার এক আধ্যাত্মিক কবচ হিসেবে এই মন্দিরগুচ্ছের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

মন্দিরগুলোর গঠনশৈলী অত্যন্ত চমকপ্রদ। মোট ১০৮টি মন্দিরকে দুটি নিখুঁত বৃত্তাকার সারিতে (concentric circles) সাজানো হয়েছে—যার বাইরের সারিতে ৫৪টি এবং ভিতরের সারিতে ৫৪টি মন্দির রয়েছে। এই জ্যামিতিক প্রতিসাম্য (Symmetry) ভক্তদের জন্য প্রদক্ষিণ বা পরিক্রমার কাজটিকে অত্যন্ত সহজ করে দেয়। প্রতিটি মন্দিরের প্রবেশদ্বারে হিন্দু পুরাণের কাহিনী সম্বলিত সূক্ষ্ম টেরাকোটা ফলক (Terracotta plaques) দর্শকদের মুগ্ধ করে। মাত্র ২ টাকার প্রবেশমূল্যে এমন এক শান্ত ও সুশৃঙ্খল স্থাপত্য দর্শনের সুযোগ সত্যিই বিরল।

এখানকার স্থাপত্য নিয়ে এক দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতায় ফুটে উঠেছে:

"মন্দিরের অভিন্নতা এবং সুশৃঙ্খল স্থাপত্যশৈলী জায়গাটিকে দৃশ্যত বিস্ময়কর করে তুলেছে। এখানকার জ্যামিতিক প্রতিসাম্য বা সিমেট্রি যে কোনো দর্শনার্থীর চোখ জুড়িয়ে দেওয়ার মতো, যা শান্ত পরিবেশে ধ্যানের এক চমৎকার আবহ তৈরি করে।"

৩. চালের দেশের মিষ্টি যখন চালের মতো: সীতাভোগ ও মিহিদানার রাজকীয় ইতিহাস

বর্ধমানের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায় এখানকার কিংবদন্তি মিষ্টি সীতাভোগ ও মিহিদানা ছাড়া। এই মিষ্টির খ্যাতির সাথে জড়িয়ে আছে ১৯০৪ সালে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জনের বর্ধমান সফরের স্মৃতি। মহারাজা বিজয় চাঁদ মহাতাবের অনুরোধে দক্ষ মিষ্টান্ন কারিগর ভৈরব চন্দ্র নাগ এক অনন্য উদ্ভাবন করেন। কার্জন এই মিষ্টির স্বাদ ও কারুকার্যে এতটাই বিমোহিত হয়েছিলেন যে তিনি ভৈরব চন্দ্র নাগকে একটি 'প্রশংসাপত্র' (Certificate of Appreciation) প্রদান করেন।

সীতাভোগ মূলত কামিনীভোগ বা গোবিন্দভোগ চালের গুঁড়োর সাথে টাটকা ছানা মিশিয়ে তৈরি হয়, যা দেখতে লম্বাটে সাদা চালের দানার মতো। অন্যদিকে, মিহিদানা হলো ঐতিহ্যবাহী বুন্দিয়ার এক 'মাইক্রো-কাজিন' বা ক্ষুদ্র সংস্করণ, যা জাফরান ও চালের গুঁড়োর মিশ্রণে তৈরি সোনালী দানা। ২০১৭ সালের ৩১শে মার্চ বর্ধমানের এই দুই গর্ব লাভ করেছে ভৌগোলিক নির্দেশক বা GI ট্যাগের সম্মানজনক স্বীকৃতি।

এই মিষ্টান্নের ঐতিহ্য সম্পর্কে বলা হয়:

"সীতাভোগ ও মিহিদানা কেবল মিষ্টান্ন নয়, এটি বর্ধমানের রাজকীয় হেঁশেলের এক অনন্য উত্তরাধিকার যা শতাব্দী প্রাচীন আভিজাত্যকে আজও অক্ষুণ্ণ রেখেছে।"

৪. চুপি চর: গঙ্গার বাঁকে তৈরি হওয়া পরিযায়ী পাখিদের এক লুকানো স্বর্গ

পূর্বস্থলীর চুপি চর প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য ইকোসিস্টেম। গঙ্গা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই ৩.৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের অশ্বখুরাকৃতি হ্রদটি (Oxbow Lake) শীতকালে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। সুদূর সাইবেরিয়া বা তিব্বত থেকে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে ভিড় জমায় লেসার হুইসলিং টিল (Lesser Whistling Teal), ব্ল্যাক-হেডেড আইবিস (Near Threatened বা প্রায় সংকটাপন্ন প্রজাতির পাখি), এমনকি বিরল প্রজাতির স্ট্রিয়েটেড হেরন (Striated Heron)-এর মতো পরিযায়ী পাখিরা।

এখানকার নৌকা ভ্রমণের মূল আকর্ষণ হলেন স্থানীয় কিংবদন্তি নৌচালক 'চিংড়ি কাকা'। তিনি কেবল পাখিদেরই নির্ভুলভাবে চেনান না, বরং তাঁর আন্তরিক আতিথেয়তা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। শীতের সকালে তিনি যেমন পাখিদের ডেরায় নিয়ে যান, তেমনই হাসিমুখে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখেন গ্রীষ্মের জন্য—যাতে নৌকা ভ্রমণে ভাসতে ভাসতে পর্যটকরা তাঁর বাগানের গাছপাকা আম উপভোগ করতে পারেন। উল্লেখ্য যে, এই অঞ্চলটি ইউরিয়া স্টিবামিনের (Urea Stibamine) উদ্ভাবক স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর জন্মভিটে হিসেবেও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই পরিবেশগত নাজুকতা (Ecological fragility) আজ হুমকির মুখে। বনভোজনের নামে উচ্চৈঃস্বরে বাজানো লাউড মিউজিক বা 'বাস মিউজিক' এখানকার শান্ত পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে, যা পরিযায়ী পাখিদের অস্তিত্বের জন্য অশনি সংকেত।

৫. কার্জন গেট থেকে রাজবাড়ি: বর্ধমানের রাজকীয় আভিজাত্য

বর্ধমান শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা কার্জন গেট বা 'বিজয় তোরণ' এই জনপদের আভিজাত্যের প্রধান স্তম্ভ। ১৯০৩ সালে মহারাজা বিজয় চাঁদ মহাতাবের রাজ্যাভিষেক (Coronation) এবং লর্ড কার্জনের আগমনকে উদযাপন করতে রোমান স্থাপত্যরীতিতে এই বিশালাকার তোরণটি নির্মিত হয়েছিল। তোরণের খিলান ও কারুকার্যে ইউরোপীয় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।

এই তোরণ পেরিয়ে সামনে গেলেই দেখা মিলবে বর্ধমান রাজবাড়ির, যার পোশাকি নাম 'মহাতাব মঞ্জিল'। ১৮৫১ সালে মহারাজা মহাতাব চাঁদ বাহাদুরের আমলে নির্মিত এই রাজপ্রাসাদটি বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্রিটিশ এবং দেশীয় দেশীয় আভিজাত্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ এই প্রাসাদটিকে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হেরিটেজ ভবনে পরিণত করেছে।

৬. উপসংহার

১০৮ শিব মন্দিরের জ্যামিতিক নিখুঁত বিন্যাস, রাজকীয় সীতাভোগ-মিহিদানার মিষ্টতা, আর চুপি চরের মায়াবী প্রাকৃতিক নিস্তব্ধতা—সব মিলিয়ে বর্ধমান যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। আধুনিকতার ভিড়েও এই শহর তার প্রাচীন শিকড়কে আঁকড়ে ধরে আছে। তবে চুপি চরের শব্দদূষণ বা ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যগুলোর পরিবেশগত সুরক্ষা আজ এক বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যটন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পাঠকদের কাছে আমার একটিই প্রশ্ন—আধুনিকতার এই দ্রুতগামী যাত্রায় আমরা কি আমাদের এই শান্ত ও অমূল্য শান্ত ঐতিহ্যের স্থানগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারছি? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই 'সাতকাহন' টিকিয়ে রাখা আমাদের সামষ্টিক দায়িত্ব।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

হুগলির গুপ্তিপাড়া রথযাত্রা ও ‘ভাণ্ডার লুট’-এর রোমাঞ্চকর ইতিহাস

  পুরীর পরেই যার স্থান: হুগলির গুপ্তিপাড়া রথযাত্রা ও ‘ভাণ্ডার লুট’-এর রোমাঞ্চকর ইতিহাস বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য পীঠস্থান হুগলি...