পুরীর পরেই যার স্থান:
হুগলির গুপ্তিপাড়া রথযাত্রা ও ‘ভাণ্ডার লুট’-এর রোমাঞ্চকর ইতিহাস
বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য পীঠস্থান হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়া। ওড়িশার পুরীর রথযাত্রার কথা জগদ্বিখ্যাত হলেও, ভারতের অন্যতম প্রাচীন এবং দূরত্বের নিরিখে দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রাটি যে আমাদের এই বাংলাতেই অনুষ্ঠিত হয়, তা অনেকেরই অজানা। ১৭৩০-এর দশক থেকে চলে আসা এই উৎসবটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং বাংলার স্থাপত্য, লৌকিক বিশ্বাস এবং প্রগতিশীল সমাজচিন্তার এক জীবন্ত দলিল।
১. ভূমিকা: বাংলার এক প্রাচীন ঐতিহ্যের হাতছানি
১৭৩০ থেকে ১৭৪০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শ্রী শ্রী বৃন্দাবন চন্দ্র জিউ মঠের স্বামী মধুসূদনানন্দ এই রথযাত্রার সূচনা করেছিলেন। হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রাচীন জনপদটি কেবল রথযাত্রার জন্যই নয়, বরং বাংলার সামাজিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের সাক্ষী। উল্লেখ্য যে, এই গুপ্তিপাড়াই হলো বাংলার প্রথম ‘বারোয়ারি’ বা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত দুর্গাপূজার (১৭৯০ সাল) সূতিকাগার। সেই একই জনমুখী ও উৎসবমুখর চেতনা কাজ করে এখানকার রথযাত্রাতেও। জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার পুণ্যলগ্নে ‘স্নানযাত্রা’র মাধ্যমে দেবতাকে স্নান করিয়ে যে উৎসবের সূচনা হয়, তার চূড়ান্ত উন্মাদনা দেখা যায় আষাঢ়ের রথযাত্রায়।
২. স্থাপত্যের বিস্ময়: শাল ও বাবলার তৈরি নবরত্ন রথ
গুপ্তিপাড়ার রথটি বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘নবরত্ন’ মন্দির স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। বর্তমান ৩৬ ফুট উঁচু এই রথটির স্থাপত্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। এর ভিত্তি ৩৪ ফুট বাই ৩৪ ফুট বর্গাকার এবং এটি চারতলা বিশিষ্ট। রথটির মূল কাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে অত্যন্ত মজবুত শাল কাঠ (Shorea robusta), আর এর বিশাল ১৬টি চাকা তৈরি হয়েছে বাবলা কাঠ (Vachellia nilotica) দিয়ে।
রথটির একটি বিশেষত্ব হলো এর অধিষ্ঠিত দেবতা। যদিও এটি জগন্নাথদেবের রথযাত্রা হিসেবে পরিচিত, তবে মঠের প্রধান আরাধ্য দেবতা রাধারমণ জিউ-কেই রথের ওপর প্রধান আসনে বসানো হয়। স্থাপত্যগতভাবে রথটি এতটাই মূল্যবান যে, বছরের বাকি সময় এটি একটি বিশালাকার ধাতব খাঁচায় তালাবদ্ধ অবস্থায় সুরক্ষিত থাকে। উৎসবের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে একে বের করে নতুন করে সাজিয়ে তোলার কাজ শুরু হয়।
৩. ভাণ্ডার লুট: যখন ভক্তি আর আনন্দ মিলেমিশে একাকার
গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো ‘ভাণ্ডার লুট’। এটি উল্টোরথের আগের দিন জগন্নাথদেবের মাসির বাড়িতে (গোসাইগঞ্জ বারাবাজার) অনুষ্ঠিত হয়। ৪০০-র বেশি মাটির মালসায় নিবেদন করা খিচুড়ি, লাবড়া, পায়েস ও মালপোয়ার ভোগ ভক্তদের লুটে নেওয়ার এই উন্মাদনা বাংলার আর কোথাও দেখা যায় না। পৌরাণিক বিশ্বাস মতে, মা লক্ষ্মী জগন্নাথদেবের ওপর অভিমান করে মাসির বাড়ির ভাণ্ডার লুট করেন, যাতে দেবতা দ্রুত মন্দিরে ফিরে আসেন।
এই প্রথাটির সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৮৫৮ সালের এক ঐতিহাসিক নথিতে দেখা যায়, সেই সময় প্রায় এক লক্ষ (১,০০,০০০) ভক্ত এই ভাণ্ডার লুটে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রথা অনুযায়ী, স্থানীয় সদগোপ (কৃষিজীবী) সম্প্রদায়ের পুরুষেরা খালি গায়ে লাঠি হাতে প্রতীকীভাবে মন্দিরে প্রবেশ করে এই প্রসাদ লুট করেন।
উৎস থেকে পাওয়া এক বর্ণনায় বলা হয়েছে:
"বিকেল ৫টার দিকে মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়ার সাথে সাথে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনার সৃষ্টি হয়। কয়েকশ মাটির মালসা ভর্তি প্রসাদ লুটে নেওয়ার জন্য সদগোপ সম্প্রদায়ের ভক্তরা ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই প্রসাদ সংগ্রহ করা অত্যন্ত ভাগ্যের ব্যাপার, তাই ঐদিন গুপ্তিপাড়ার ঘরে ঘরে উনুন জ্বলে না, সবাই এই লুটের প্রসাদেই তৃপ্ত হন।"
৪. ১৩ থেকে ৯: একটি দুর্ঘটনার স্মৃতি বহনকারী চূড়া
ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারায় এই রথের কাঠামোতেও আমূল পরিবর্তন এসেছে। অতীতে এই রথটি ১৩টি চূড়া বা শিখর বিশিষ্ট ছিল। কিন্তু ১৮৭৩ সালে রথযাত্রার সময় একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। সেই দুর্ঘটনায় মঠের তৎকালীন দণ্ডীস্বামী স্বামী পৃথানন্দ রথের তলায় চাপা পড়ে প্রাণ হারান। এই শোকাবহ ঘটনার পর রথের ভারসাম্য ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এর উচ্চতা কিছুটা কমিয়ে শিখর সংখ্যা ১৩ থেকে কমিয়ে ৯ করা হয়। সেই থেকেই এটি ‘নবরত্ন’ শৈলী ধারণ করে চলেছে, যা আজ একটি নিরাপত্তা-চালিত স্থাপত্য বিবর্তনের প্রতীক।
৫. দূরত্বের নিরিখে পুরীর পরেই যার স্থান
পুরীর জগন্নাথধামের পর গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রাই ভারতের দ্বিতীয় দীর্ঘতম পথ অতিক্রম করে। বৃন্দাবন চন্দ্র জিউ মঠ থেকে শুরু করে গোসাইগঞ্জ বারাবাজারের মাসির বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ১.৫ কিলোমিটার পথ এই রথ টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতি বছর বর্ধমান, নদীয়া, হাওড়া এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলা থেকে হাজার হাজার ভক্ত এখানে ভিড় জমান। কাদা-মাখা রাস্তায় খালি পায়ে রথের রশি টানার যে আবেগ, তা দেখার মতো। এই বিপুল জনসমাগম গুপ্তিপাড়াকে কেবল একটি গ্রাম নয়, বরং একটি আঞ্চলিক মিলনক্ষেত্রে পরিণত করে।
৬. লিঙ্গ সাম্য ও বিশেষ রশি: নারীদের বিশেষ অংশগ্রহণ
গুপ্তিপাড়ার ঐতিহ্যের একটি অত্যন্ত প্রগতিশীল ও উদার দিক হলো রশি টানার ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সংরক্ষিত অধিকার। রথ টানার জন্য ব্যবহৃত ৩০০ ফুট লম্বা চারটি প্রধান রশির মধ্যে একটি রশি সম্পূর্ণভাবে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট থাকে। বৈষ্ণব ধর্মের উদারতা এবং তৎকালীন বাংলার সমাজব্যবস্থায় নারীর মর্যাদার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আজও টিকে আছে এই অনন্য প্রথা।
৭. উপসংহার: ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও আগামী দিনের ভাবনা
গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক অমূল্য উত্তরাধিকার। তবে সময়ের আবর্তে এই প্রাচীন কাষ্ঠ-স্থাপত্যটি আজ ক্ষয়ে যাচ্ছে। ২০১২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, রথটির অবস্থা অত্যন্ত জরাজীর্ণ। মঠের পক্ষ থেকে প্রতি বছর অস্থায়ী মেরামত করা হলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ (ASI) ও প্রশাসনের সক্রিয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
আজকের আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের কাছেই একটি প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন—যে ঐতিহ্যের শেকড় ৩০০ বছরের প্রাচীন, যা আমাদের সমাজকে একতাবদ্ধ করে, তাকে কি আমরা যথাযথ সুরক্ষা দিতে পারছি? গুপ্তিপাড়ার রথের চাকা যেন কেবল দেবতার যাত্রাপথ নয়, বরং আমাদের হারানো ইতিহাসের পুনরুদ্ধারের বার্তাও বহন করে আনে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.