দেখা
ফেলুদা সিধু জ্যাঠাকে বলেছিল , আপনি গোয়েন্দাগিরি
করলে আমাদের ভাত মারা যেত । উত্তরে সিধু জ্যাঠা বলেছিলেন – আমি অনেক কিছু করলেই , অনেকের
ভাত মারা যেত ফেলু , তাই শুধু মনের দরজা-জানলাগুলো খুলে বসে থাকি । মনের দরজা – জানলাগুলো
একটু ফাঁক করে রাখলেই মাঝেমধ্যে এমন সব অভিজ্ঞতা হয় যা চেতনাকে রীতিমত ঝাঁকুনি দিয়ে
যায় । মূল ঘটনায় যাওয়ার আগে একটা দৃষ্টান্ত দিই । ‘প্রাক্তন’ ছবিটা আমরা অনেকেই দেখেছি
। এখানে অপরাজিত আঢ্য অভিনীত চরিত্রটি এমনভাবে আঁকা হয়েছে যাকে আপাতদৃষ্টিতে তুলনায়
স্বল্প শিক্ষিত , জোরে জোরে এবং বেশি কথা বলা এমন একজন বিরক্তিকর মহিলা বলে মনে হয়
, যার বুদ্ধিতে কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে । অথচ ঠিক সময়ে সে নিজেই বুঝতে পারে তাঁর স্বামীর
প্রাক্তন স্ত্রীর সঙ্গেই সে ট্রেনযাত্রায় মিতালি পাতিয়েছে । ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার
আগে প্রাক্তন স্ত্রী, বর্তমান স্ত্রীর ঠিকানাটা চায় বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে উপহার
পাঠানোর জন্য । বর্তমান স্ত্রী অপরাজিতা আলতো করে , প্রাক্তন স্ত্রীর গালে হাত বুলিয়ে
বলেন – তুমি তো আমাকে , তোমার জীবনের সেরা গিফটটা দিয়েই দিয়েছ দিদিভাই , আমার স্বামী
! প্রাক্তন স্ত্রী হাঁ , দর্শক হাঁ , পরিচালকদ্বয়ের মাস্টারস্ট্রোক এবং অপরাজিতার অসাধারণ
অভিনয়ে, কিস্তি এবং মাত ! কাজেই কে আসলে কী, সহজে বোঝা সহজ নয় ।
এক ব্যাঙ্ক পিয়নের সঙ্গে পরিচয় আছে । তাঁকে
ফোন করে জানতে চাইলাম , কাল কি ব্যাঙ্ক বন্ধ নাকি গো ? – কেন ? রাজ্য সরকার দেখলাম
পয়লা জুলাই ছুটি ঘোষণা করেছে । -- কিসের ? ডক্টরস ডে । --- আমরা ডক্টর থোরি না আছি
। তাহলে ব্যাঙ্ক খোলা ? – হ্যাঁ ,হ্যাঁ খোলা । এবার আসল গল্প । আমি ফোন করতেই কোভিড
বাণীর পরে কলার টিউন বাজা শুরু হল – “অ্যাই ছেলেটা , নাম কী তোর ? আমি বললাম – ফুসমন্তর
।“ ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় জয় গোস্বামীর ‘মেঘবালিকার জন্য রূপকথা’ । আমি হাঁ
! সত্যি কথা বলতে কী , কি বলব সেটাই গুলিয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য । শিখলাম , মুখের
ভাষা দিয়ে রুচির বিচার করতে নেই , পেশা , সামাজিক অবস্থান দিয়েও না । হয়ত ওই লাইনদুটোই
ওর ভাল লেগেছে । কিন্তু সেই ভাল লাগাটুকুর জন্যও একটা সংবেদনশীল মন তৈরি থাকা দরকার
। অথচ আপাতদৃষ্টিতে ওই পিয়নকে দেখে কিন্তু এটা বোঝার উপায় নেই । আমরা একজন মানুষকে
দেখে তাঁর পছন্দ-অপছন্দ কেমন হতে পারে , বুদ্ধিসুদ্ধি , বিচার-বিবেচনা , বিচক্ষণতা
কেমন হতে পারে সেই ব্যাপারে মনে মনে একটা ধারণা তৈরি করে ফেলি । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে
সেটা মিলেও যায় । এক উচ্চপদস্থ সাংবাদিক দাদাকে চিনি , গত ষোল বছর ধরে যাঁর কলার টিউন
বেঠোফেনের একটা সিম্ফনি । কিন্তু আজকের ঘটনায়, আমার মনের অবচেতনে আগে থেকে সেই পিয়ন
সম্বন্ধে তৈরি হয়ে থাকা ধারণাটাতো মিলল না । এটা আমার কাছে একটা বড় শিক্ষা । বাবা বলতেন
, খবরের কাগজ , পত্রপত্রিকার চিঠিগুলো অবশ্যই পড়বি । দেখবি , কত অজ পাড়া-গাঁ থেকে কেমন
তথ্যসমৃদ্ধ সব চিঠি আসে । সত্যিই তাই । আমি কোনওদিন গ্রামে থাকিনি । কিন্তু খবরের কাগজ
ও পত্রিকার চিঠি পড়ে আমার মনে গ্রাম সম্পর্কে আগে থেকে তৈরি হয়ে থাকা অনেক ধারণা পাল্টেছে
।
ক্লাস সিক্সে আমাদের একটা ইংরেজি গদ্য পাঠ্য ছিল – ‘রাইট জাজমেন্ট’ । সঙ্গে একটা ছবি , অর্ধেকটা জলে ভরা একটা কাচের পাত্রের মধ্যে একটা কাচের দণ্ড ডোবানো । বাইরে থেকে দণ্ডের ডোবানো অংশটা দেখতে বাঁকা লাগছে , কিন্তু আসলে সেটা দেখার ভুল । এভাবে দণ্ডটাকে দেখে সেটা আদতে বাঁকা ভাবা সঠিক বিচার নয় , রাইট জাজমেন্ট নয় । সঠিকভাবে দেখতে হলে দণ্ডটাকে জল থেকে তুলে চোখের সামনে আনতে হবে । পরে জেনেছি বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই ঘটনাকে প্রতিসরণ(Refraction) বলে । ছোটবেলার অনেক শিক্ষা বড় হয়ে হঠাৎ করে কাজে লেগে যায় । আজকের ঘটনা আমাকে বলছে --- “দেখো রে , নয়ন মেলে , জগতের কী বাহার !”

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.