রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬

কলকাতার হারিয়ে যাওয়া গ্রীক ইতিহাস




 

কলকাতার হারিয়ে যাওয়া গ্রীক ইতিহাস: ১৮ শতকের এক বিস্ময়কর ভূমধ্যসাগরীয় আখ্যান

আঠারো শতকের কলকাতার গলিগুলোতে কান পাতলে আজও হয়তো শোনা যায় এক বহুভাষিক কসমোপলিটান বা বিশ্বজনীন কোলাহল। গঙ্গার পলিমাটিতে সেদিন পা রেখেছিলেন চিনা কারিগর, আর্মেনীয় বণিক, ইহুদি ব্যবসায়ী আর স্কটিশ অ্যাডভেঞ্চারাররা। কিন্তু এই বিচিত্র ভিড়ের মধ্যে এমন একদল মানুষ ছিলেন, যাঁদের ইতিহাস আজ প্রায় বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে—তাঁরা হলেন ভূমধ্যসাগরীয় গ্রীক সম্প্রদায়। আজ যেখানে ব্যস্ত শহরের ট্রামলাইন আর আধুনিক দালান, সেখানে একসময় গ্রীকদের বাণিজ্যতরী ভিড়ত, গির্জার ঘণ্টায় বেজে উঠত এক প্রাচীন সভ্যতার প্রতিধ্বনি। কিন্তু কেন এই রোমাঞ্চকর ইতিহাস আজ আমাদের কাছে কেবল একটি 'বিস্মৃত অধ্যায়'? কলকাতার ধূলিকণায় মিশে থাকা এই গ্রীক উত্তরাধিকার কি সত্যিই কোনোদিন পুনরুদ্ধার করা সম্ভব?

এই বিস্ময়কর আখ্যানের এক উজ্জ্বল ও রহস্যময় নায়ক হলেন দিমিত্রিওস গ্যালানোস (Dimitrios Galanos)। ১৭৬০ সালে এথেন্সে জন্ম নেওয়া এই ক্ষুরধার পণ্ডিত ১৭৮৬ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে কলকাতায় আসেন। তাঁর আসার উদ্দেশ্য ছিল কলকাতার গ্রীক বণিক সন্তানদের শিক্ষকতা করা। কিন্তু বাংলার মাটির জাদু তাঁকে জ্ঞানসাধনার এক অন্য স্তরে নিয়ে গিয়েছিল। ইংরেজি, ফার্সি আর হিন্দুস্তানি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের পর গ্যালানোস কলকাতার মোহ ছেড়ে ১৭৯৩ সালে চলে যান বারাণসীতে। সেখানে তিনি একজন নিষ্ঠাবান সংস্কৃত পণ্ডিত বা 'ব্রাহ্মণ' হিসেবে জীবন অতিবাহিত করতে শুরু করেন। গ্যালানোস যে কেবল শাস্ত্র পড়তেন তা নয়, তিনি ছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রজ্ঞার মাঝে এক অনন্য সেতুবন্ধন। সংস্কৃত থেকে গ্রীক ভাষায় তিনি অসংখ্য কালজয়ী গ্রন্থ অনুবাদ করেন, যার মাধ্যমে ইউরোপ প্রথম ভারতীয় দর্শনের গভীরতা আঁচ করতে পেরেছিল। ১৮৩৩ সালে এই মহান জ্ঞানসাধকের মৃত্যুর পর তাঁর পরম বন্ধু মুন্সি শীতল সিং (Munśī Śীtal Sinh) ফার্সি ভাষায় একটি সমাধিফলক রচনা করেন, যা আজও গ্যালানোসের পাণ্ডিত্যের সাক্ষ্য দেয়:

"হায়, শতবার আক্ষেপ! দিমিত্রিওস গ্যালানোস এই পৃথিবী ছেড়ে চিরস্থায়ী আবাসে চলে গেছেন... এই শতাব্দীর প্লেটো চলে গেলেন!"

গ্যালানোসের এই আধ্যাত্মিক সাধনার সমান্তরালে আঠারো শতকের বাংলায় গ্রীক বণিকরা গড়ে তুলছিলেন এক বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য। বিশেষ করে সিলেটের পান্ডুয়া পাহাড়ের চুনাপাথর (Limestone) ব্যবসায় গ্রীকদের আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত। আলেকজান্ডার প্যানিওটির মতো ব্যবসায়ীরা এই খাতে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন। গ্রীকদের এই বাণিজ্যিক উত্থান ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেয়। সিলেটের তৎকালীন ব্রিটিশ কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসে (Robert Lindsay) এবং জন উইলেস (John Willes) গ্রীকদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান। গ্রীকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তাঁদের কোনো বৈধ 'পারওয়ানা' বা বাণিজ্য লাইসেন্স নেই। এমনকি ব্রিটিশ প্রশাসনের মধ্যে এই ভীতিও কাজ করছিল যে, গ্রীকরা হয়তো পান্ডুয়া পাহাড়ের পাদদেশে নিজস্ব একটি 'গ্রীক কলোনি' স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। ব্রিটিশদের এই বৈরী নীতির কারণে গ্রীক বণিকরা একসময় চুনাপাথরের একচেটিয়া ব্যবসা ছেড়ে চাল ও লবণের বাণিজ্যে মন দিতে বাধ্য হন। এই বাণিজ্যিক সংঘাতটি ছিল বাংলার আদিম উপজাতীয় অর্থনীতিকে বিশ্ব পুঁজিবাদের সাথে যুক্ত করার এক জটিল সন্ধিক্ষণ।

ব্যবসায়িক সংঘাত ছাপিয়ে গ্রীকদের শৈল্পিক উপস্থিতিও কলকাতার বুকে এক অমর ছাপ রেখে গেছে। কলকাতার বিখ্যাত সেন্ট জনস চার্চের দিকে তাকালে শিল্পী জফানি (Zoffany)-র আঁকা 'দ্য লাস্ট সাপার' পেইন্টিংটি নজরে পড়বে। এই ছবিতে যিশুর মডেল হিসেবে জফানি বেছে নিয়েছিলেন এক গ্রীক যাজককে—ফাদার কনস্টানটাইন পার্থেনিওস (Constantine Parthenios)। যাজক কনস্টানটাইনের সেই ভাবগম্ভীর অবয়ব আজও শিল্পের মাঝে গ্রীকদের উপস্থিতিকে জীবন্ত করে রেখেছে। এটি কেবল একটি শিল্পকর্ম নয়, বরং সে সময়ের ধর্মীয় ও সামাজিক সহাবস্থানের এক অনন্য দলিল। গ্যালানোস যেমন হিন্দু শাস্ত্রের গভীরে ডুবে গিয়েছিলেন, তেমনি ফাদার কনস্টানটাইন কলকাতার ইউরোপীয় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন।

তবে ইতিহাসের পাতায় বিশ্বাসঘাতকতার এক করুণ বিষাদগাথাও লেখা আছে। গ্যালানোস তাঁর দীর্ঘ সাধনায় চাণক্যের শ্লোকগুলো সংস্কৃত থেকে গ্রীক ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। গ্রীক ক্যাপ্টেন নিকোলাস কেফালাস (Nikolaos Kephalas) বারাণসীতে গ্যালানোসের বিশ্বাস অর্জন করে তাঁর পাণ্ডুলিপিটি গ্রীসে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু কেফালাস পাণ্ডুলিপিটি চুরি করে ভ্যাটিকান লাইব্রেরিতে নিজের নামে প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি গ্যালানোসকে কেবল একজন 'সহকারী' হিসেবে উল্লেখ করে জ্ঞানসাধনার যাবতীয় কৃতিত্ব আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক প্রতারণা গ্যালানোসের জীবনে এক বড় ট্র্যাজেডি হয়ে রয়ে গেছে।

কলকাতার গ্রীক সমাজের উত্থানে সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম ছিল অ্যালেক্সিওস আরগিরি প্যানাঘিওটিস, যাঁকে সকলে 'হাজি' (Hadjee) আলেকজান্ডার প্যানিওটি নামে চিনতেন। জেরুজালেম ভ্রমণের কারণে তিনি এই 'হাজি' উপাধি পেয়েছিলেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই মানুষটিকে ১৭৭১ সালে মিশরে এক বিশেষ কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়েছিল। প্যানিওটির প্রচেষ্টাতেই কলকাতার আমরতলা স্ট্রিটে প্রথম গ্রীক গির্জা 'চার্চ অফ দ্য ট্রান্সফিগারেশন' (Church of the Transfiguration) প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও ১৭৭৭ সালে ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়, কিন্তু তাঁর পরিবারের ঐকান্তিক চেষ্টায় ১৭৮১ সালে গির্জাটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

কলকাতার এই গ্রীক ইতিহাসের শেষ সাক্ষী হয়ে আজ দাঁড়িয়ে আছে ফুলবাগানের (মৌলানা আবুল কালাম আজাদ সরণি) গ্রীক কবরস্থান। এটি কেবল ভারতের একমাত্র গ্রীক কবরস্থানই নয়, বরং সমগ্র এশিয়ার মধ্যে টিকে থাকা একমাত্র গ্রীক সমাধিক্ষেত্র। এখানে ১২০টি সমাধি রয়েছে, যার ১০৮টিতে নামফলক বর্তমান। বর্তমানে এই হেরিটেজ স্থানটির অবস্থা অত্যন্ত জীর্ণ। আগাছা আর অবৈধ দখলের কবলে পড়া এই কবরস্থানটি যেন এক বিস্মৃত সভ্যতার দীর্ঘশ্বাস। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৮ শতকের ঐতিহ্যবাহী এই কবরস্থানে সর্বশেষ সমাহিত করা হয়েছিল এক গ্রীক নারীকে, সালটি ছিল ২০০৩ (মতান্তরে ২০১৩)। তাঁর সমাধিস্থ হওয়ার মধ্য দিয়েই যেন কলকাতার গ্রীক উত্তরাধিকারের কফিনে শেষ পেরেকটি মারা হয়েছে।

কলকাতার গ্রীক বণিকদের অবদান বাংলার অর্থনীতিকে সুদূর ইউরোপ ও বিশ্বপুঁজিবাদের সাথে সংযুক্ত করেছিল। দিমিত্রিওস গ্যালানোসের মতো পণ্ডিতরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে বৈশ্বিক বাতাবরণ তৈরি করেছিলেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। পরিশেষে একটি প্রশ্ন আমাদের তাড়া করে ফেরে—কলকাতার ধূলিকণায় মিশে থাকা এই অমূল্য ভূমধ্যসাগরীয় উত্তরাধিকার কি আমরা সত্যিই রক্ষা করতে পারছি, নাকি এটি সময়ের গর্ভে চিরতরে হারিয়ে যাবে? আমাদের শৈথিল্যের কারণে একটি কসমোপলিটান ইতিহাসের মৃত্যু কি অনিবার্য?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

  গাছতলার মেয়েটি আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও...