সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

 



গাছতলার মেয়েটি

আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও মুখে শোনা নয়। ১৯৮১ সালের কথা, তখন আমার বয়স বাইশ, সদ্য বি.এড. পাশ করে মুর্শিদাবাদ জেলার একটা প্রত্যন্ত গ্রামে — নাম বলছি না, শুধু বলছি "কাশীনগর" — প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পেয়েছিলাম। গ্রামটা তখন এমন ছিল যে সন্ধ্যা সাতটার পর কোনো আলো জ্বলত না, শুধু কুপি আর হ্যারিকেন। বিদ্যুৎ আসেনি তখনও। গ্রামের এক প্রান্তে একটা পুরনো তেঁতুল গাছ ছিল, স্থানীয় লোকে বলত "বুড়ো তেঁতুল"। গাছটার বয়স নাকি দুশো বছরের কম নয়। ওই গাছটার নিচে দিয়ে যে রাস্তা গেছে, সেটাই একমাত্র সংক্ষিপ্ত পথ — স্কুল থেকে আমার থাকার জায়গা, মাস্টারমশাই হরিপদবাবুর বাড়ি — সেখানে যাওয়ার। ঘুরপথে গেলে প্রায় তিন কিলোমিটার বেশি হাঁটতে হত। গ্রামের লোকেরা আমাকে প্রথম দিনই বলে দিয়েছিল, "মাস্টার, সন্ধ্যার পর ওই তেঁতুলতলা দিয়ে যাবেন না।" আমি তখন শহরে বড় হওয়া ছেলে, বিজ্ঞানের ছাত্র, এসব কথায় বিশ্বাস করতাম না। মনে মনে হাসতাম — গ্রাম্য কুসংস্কার। তেঁতুলতলার ইতিহাসটা আমি পরে জেনেছিলাম হরিপদবাবুর কাছে। প্রায় পনেরো-ষোলো বছর আগে, ওই গাছের নিচে একটা মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মারা যায়। মেয়েটির নাম ছিল কমলা। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে অকথ্য অত্যাচার সহ্য করত, শেষে একদিন রাতে নিজের বাপের বাড়ি ফেরার পথেই ওই গাছে দড়ি দিয়েছিল। পুলিশ এসেছিল, কাগজপত্র হয়েছিল, কিন্তু গ্রামে ব্যাপারটা "আত্মহত্যা" বলেই মিটে গিয়েছিল। তারপর থেকে ওই জায়গা নিয়ে অনেক কথা চালু হয়ে গেছে — রাতে সাদা শাড়িতে একটা মেয়েকে দেখা যায়, কেউ কেউ বলে কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। আমি প্রথম দুই মাস এসব কথায় কান দিইনি। বরং একদিন সন্ধ্যায় ইচ্ছে করেই ওই পথ দিয়ে গিয়েছিলাম, প্রমাণ করতে যে ভয়ের কিছু নেই। কিছুই হয়নি সেদিন। মনে মনে হেসেছিলাম গ্রামের লোকদের নিয়ে। আসল ঘটনাটা ঘটেছিল সেই বছরের অক্টোবর মাসে, কালীপুজোর ঠিক দুদিন আগে। সেদিন পাশের গ্রাম রামনগরে একটা বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রণ ছিল আমার। হরিপদবাবুও গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি আগেই ফিরে এসেছিলেন সাইকেলে। আমার সাইকেল ছিল না তখনও, তাই হেঁটেই ফিরতে হচ্ছিল। বিয়েবাড়ি থেকে বেরোতে বেরোতে রাত হয়ে গেল প্রায় সাড়ে দশটা। আকাশে চাঁদ ছিল, তবে মেঘে ঢাকা ছিল বারবার। শীত পড়তে শুরু করেছে, তাই কুয়াশাও নেমেছিল হালকা। মাঠের পথ ধরে হাঁটছিলাম। দূর থেকেই তেঁতুলতলা দেখা যাচ্ছিল, গাছের ডালপালা কালো আকাশের গায়ে আঁচড়ের মতো লেগেছিল। মনে মনে একটু হিসেব করলাম — ঘুরপথে গেলে অন্তত পঁয়তাল্লিশ মিনিট বেশি লাগবে, আর শরীর তখন ক্লান্ত, খাওয়াদাওয়ার পর ঘুম ঘুম ভাবও এসেছে। ভাবলাম, যাই সোজা পথেই। গাছের কাছাকাছি আসতে আসতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল — বাতাস যেন থেমে গেল। তার আগে হালকা হাওয়া বইছিল, ধানের খেতের গন্ধ আসছিল, কিন্তু গাছের প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে আসতেই সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেল। ঝিঁঝি পোকার ডাকও থেমে গিয়েছিল, খেয়াল করেছিলাম পরে। গাছের ঠিক নিচে, রাস্তার একপাশে, একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সাদা শাড়ি পরা, মাথায় ঘোমটা টানা। প্রথমটায় ভাবলাম কোনো গ্রামের মেয়ে, রাত হয়ে গেছে বলে দাঁড়িয়ে আছে কারও জন্য অপেক্षায়। আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "কে আপনি? এত রাতে এখানে একা কেন?" মেয়েটি মুখ তুলল না প্রথমে। তারপর নিচু গলায় বলল, "বাড়ি যাব, মাস্টারবাবু। একটু সঙ্গে নিয়ে যাবেন?" আমাকে "মাস্টারবাবু" বলাটা তখন অস্বাভাবিক লাগেনি, কারণ গ্রামে সবাই আমাকে ওই নামেই চিনত। আমি বললাম, "কোথায় বাড়ি তোমার?" "এই তো, একটু এগিয়ে।" আমরা হাঁটতে লাগলাম পাশাপাশি। মেয়েটির মুখ আমি ভালো করে দেখতে পাচ্ছিলাম না, কারণ সে মাথা নিচু করে হাঁটছিল, আঁচল টানা। কিন্তু আমার একটা খটকা লাগল — ওর পায়ের কোনো শব্দ হচ্ছিল না। আমার নিজের চটির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম মাটিতে, কিন্তু মেয়েটির পায়ের কোনো আওয়াজ নেই। প্রথমে ভাবলাম খালি পায়ে হাঁটছে বলে হয়তো শব্দ কম, কিন্তু ক্রমেই খেয়াল করলাম, ওর হাঁটা একেবারে নিঃশব্দ — এটা আমার মনে খচখচ করতে লাগল। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, "তোমার নাম কী?" সে কোনো উত্তর দিল না। শুধু বলল, "আর একটু, মাস্টারবাবু।" আমি একবার পাশ ফিরে তাকালাম মেয়েটির দিকে, আর সেই মুহূর্তে মেঘ কেটে গিয়ে চাঁদের আলো পড়ল তার মুখে। মুখটা দেখে আমার সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। চোখদুটো ছিল, কিন্তু তার মধ্যে কোনো চাহনি নেই — যেন পুতুলের চোখ। আর গলার নিচে, শাড়ির আঁচলের ফাঁক দিয়ে, একটা দাগ দেখতে পেলাম — গলার চারপাশে গভীর, কালচে দাগ, যেন কিছু দিয়ে চেপে ধরা হয়েছিল। আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। মেয়েটি তখনও হাঁটতে লাগল, কিন্তু আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, "কী হল, মাস্টারবাবু? দাঁড়িয়ে গেলেন কেন?" আমার গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছিল না। পা যেন মাটিতে গেঁথে গিয়েছিল। মেয়েটি তখন আরও কাছে এল, আর আমি স্পষ্ট দেখলাম — তার পা মাটি স্পর্শ করছে না। মাটি থেকে সামান্য উপরে, প্রায় এক ইঞ্চি, ভেসে ভেসে হাঁটছে। আমি জোরে চিৎকার করে উঠলাম, পিছন ফিরে দৌড় দিলাম। কতক্ষণ দৌড়েছিলাম জানি না। পড়ে গিয়েছিলাম একবার, হাঁটু কেটে গিয়েছিল, তবু উঠে দৌড়েছিলাম। পিছনে তাকাইনি একবারও। হরিপদবাবুর বাড়িতে যখন পৌঁছলাম, আমার অবস্থা এমন ছিল যে তিনি দরজা খুলেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। জামা ছিঁড়ে গেছে, হাঁটু দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, শরীর কাঁপছে থরথর করে। জল খাইয়ে, বসিয়ে যখন আমার কাছে সব শুনলেন, তার মুখ থেকে রক্ত সরে গিয়েছিল। তিনি বললেন, "তুমি যা বললে, তা কমলার বর্ণনার সাথে পুরো মিলে যায়। গলার দাগ, সাদা শাড়ি — এটাই তো ওর মৃত্যুর সময়ের অবস্থা।" তারপর একটা কথা তিনি বললেন, যা আমার গায়ে কাঁটা দিয়েছিল। তিনি বললেন, "নির্মল, তুমি কি জানো, ও যাদের সাথে কথা বলে, তারা প্রায় প্রত্যেকেই দুর্ঘটনায় পড়ে? তিন বছর আগে বিশু মণ্ডল ওই পথ দিয়ে রাতে গরু আনতে গিয়েছিল। ফিরে এসে বলেছিল ঠিক এই রকম একটা মেয়ের সাথে দেখা হয়েছে। এক মাসের মধ্যে বিশু কলেরায় মারা যায়।" আমি সেই রাতে ঘুমাতে পারিনি। পরদিন সকালে আমি জ্বরে পড়লাম, প্রায় দশদিন। গ্রামের কবিরাজ এসে কী একটা পাঁচন খাওয়ালেন, বললেন "ভয়ের জ্বর, ওষুধে সারবে না, সময় লাগবে।" জ্বর সেরে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আমি আর কোনোদিন সন্ধ্যার পর ওই তেঁতুলতলা দিয়ে যাইনি। বছরখানেক পরে বদলি হয়ে অন্য স্কুলে চলে গিয়েছিলাম। আজ চুয়াল্লিশ বছর পরেও, প্রতি বছর কালীপুজোর সময় আমার ঘুম ভেঙে যায় মাঝরাতে, আর মনে হয় কেউ আমার কানের কাছে বলছে — "আর একটু, মাস্টারবাবু।" কয়েক বছর আগে শুনেছিলাম, ওই তেঁতুল গাছটা এখনও আছে, তবে গ্রামে এখন বিদ্যুৎ এসে গেছে, রাস্তায় আলো লাগানো হয়েছে। তবু বলে, সন্ধ্যার পর ওই আলোও নাকি মিটমিট করে একটু বেশি, ঠিক ওই জায়গাটায় । আমি এখনও জানি না, সেদিন রাতে যা দেখেছিলাম, তা সত্যিই কমলার আত্মা ছিল, নাকি ক্লান্ত মন আর ভয়ের কল্পনা। কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি — সেই গলার দাগ, সেই মাটি না-ছোঁয়া পা, আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম। আর তার পর থেকে কোনো কথাকে গ্রাম্য কুসংস্কার বলে আমি আর হেসে উড়িয়ে দিতে পারি না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

  গাছতলার মেয়েটি আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও...