রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

একটি ঘুমপাড়ানি গান ও ৪ লক্ষ মৃত্যু: বাংলার ইতিহাসে বর্গি হামলা

 



একটি ঘুমপাড়ানি গান ও ৪ লক্ষ মৃত্যু: বাংলার ইতিহাসে বর্গি হামলার অজানা ট্র্যাজেডি

"খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে..."—বাঙালির শৈশব আর এই ঘুমপাড়ানি গান যেন অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু এই অতিপরিচিত সুরের আড়ালে যে কী ভয়ানক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা আমরা কজন জানি? ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশক ধরে মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনী বা 'বর্গি'রা বাংলার জনপদে যে অবর্ণনীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা আজও বাঙালির সমষ্টিগত স্মৃতিতে এক গভীর ক্ষত। একজন ইতিহাস বিশেষজ্ঞ এবং কলামিস্ট হিসেবে আজ আমি আপনাদের সামনে বর্গি হামলার এমন ৫টি বিস্ময়কর তথ্য তুলে ধরব, যা আমাদের ইতিহাসের এই ভুলে যাওয়া অধ্যায়কে নতুন করে চিনতে সাহায্য করবে।

বর্গি কারা ছিল? (পরিভাষার ব্যুৎপত্তি ও যুদ্ধরীতি)

'বর্গি' শব্দটি এসেছে মূলত হিন্দুস্তানি শব্দ 'বরগির' (Bargir) থেকে, যার আদি উৎস ফারসি ভাষা। মারাঠা কনফেডারেশনের এই বিশেষ অশ্বারোহী বাহিনী মূলত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। 'বর্গি' এবং 'শিলেদার'-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটি হলো:

  • বর্গি: এরা ছিল হালকা অশ্বারোহী সৈন্য, যাদের ঘোড়া এবং যুদ্ধের যাবতীয় সরঞ্জাম সরকার সরবরাহ করত।
  • শিলেদার: এরা নিজেদের ঘোড়া ও সরঞ্জাম নিজেরাই বহন করত।

মারাঠারা বাংলায় মূলত 'বরগির-গিরি' (Bargir-giri) নামক এক বিশেষ গেরিলা যুদ্ধরীতি প্রয়োগ করেছিল। নবাব আলীবর্দী খাঁ-র ধীরগতির বিশাল পদাতিক বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে বাংলার গ্রামে গ্রামে হানা দিত। তাদের উদ্দেশ্য কোনো অঞ্চল জয় করা ছিল না, বরং লুণ্ঠন আর ধ্বংসলীলাই ছিল প্রধান লক্ষ্য।

১. একটি ঘুমপাড়ানি গানের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক

বর্গি হামলা বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও স্মৃতিতে কতটা গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছিল, তা এই লোকপ্রিয় ছড়াটি থেকেই স্পষ্ট হয়। লুণ্ঠনের ফলে যখন সাধারণ মানুষের খাজনা দেওয়ার উপায় থাকতো না, তখন সেই অসহায়ত্ব ফুটে উঠত এই পঙ্‌ক্তিগুলোতে:

"খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেবো কিসে? ধান ফুরালো, পান ফুরালো, খাজনার উপায় কি? আর কটা দিন সবুর করো, রসুন বুনেছি।"

এটি কেবল একটি ছড়া নয়, বরং তৎকালীন বাংলার মায়েদের জন্য ছিল একটি প্রতিরক্ষা কবচ। বর্গিদের আসার ভয় দেখিয়ে তারা সন্তানদের ঘুম পাড়াতেন। এই 'বর্গি ভীতি' পরবর্তী কয়েকশ বছর ধরে বাঙালির মানসিকতায় এক ট্রমা হিসেবে টিকে ছিল।

২. যুদ্ধের অকল্পনীয় নৃশংসতা এবং চার লক্ষ মানুষের মৃত্যু

বর্গি হামলা কোনো সাধারণ সামন্ততান্ত্রিক লড়াই ছিল না, এটি ছিল ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৎকালীন ফ্যাক্টরি প্রধান জান কেরসেবুমের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল পশ্চিম বাংলা এবং বিহারে এই হামলার ফলে প্রায় ৪,০০,০০০ (চার লক্ষ) বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। আঠারো শতকের বাংলা কাব্য 'মহারাষ্ট্র পুরাণ'-এ কবি গঙ্গারাম এই নৃশংসতার এক হাড়হিম করা বর্ণনা দিয়েছেন:

"তারা বারবার চিৎকার করে বলত, 'টাকা দাও', এবং যখন টাকা পেত না, তারা মানুষের নাসারন্ধ্রে জল ভরে দিত, কাউকে পুকুরে ডুবিয়ে মারত... যারা টাকা দিতে পারত না, তাদের তারা হত্যা করত।"

বর্গিরা লুণ্ঠনের সময় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালাত। নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষকের ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া ছিল তাদের নিত্যদিনের কাজ।

৩. বাংলার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া লুণ্ঠন

বাংলার তৎকালীন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই ছিল বর্গিদের প্রধান আকর্ষণ। এই ক্রমাগত হামলায় বাংলার বিখ্যাত রেশম এবং বস্ত্র শিল্প ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বর্গিরা তাঁতিদের ঘরবাড়ি ও তাঁত পুড়িয়ে দিত, যার ফলে রেশম ও তুলা চাষীরা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এমনকি তারা তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যাংকার জগৎ শেঠের বাড়িতে হানা দিয়ে নগদ তিন লক্ষ টাকা এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুণ্ঠন করে। ১০ বছরের এই অরাজকতা বাংলার কৃষি ও বাণিজ্যের এতটাই ক্ষতি করেছিল যে, সেই ধাক্কা সামলাতে বাংলার অর্থনীতির বহু বছর সময় লেগেছিল।

৪. 'মারাঠা ডিচ' এবং কলকাতার সুরক্ষা কবচ

বর্গিদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের চারপাশ দিয়ে একটি বিশাল পরিখা বা নালা খনন করেছিল, যা ইতিহাসে 'মারাঠা ডিচ' (Maratha Ditch) নামে পরিচিত। এই প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাটি মূলত ব্রিটিশ এবং তাদের অনুগত বণিকদের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। মজার ও ঐতিহাসিক তথ্য হলো, এই পরিখাটির দক্ষিণে অর্থাৎ মূল কলকাতায় যারা বসবাস করতেন, তাদের ব্যঙ্গ করে পরবর্তীতে 'ডিচার্স' (Ditchers) ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল। এই পরিখাটি পরে ভরাট করে বর্তমানের 'আপার সার্কুলার রোড' তৈরি করা হয়েছে।

৫. ধর্মীয় মেরুকরণের ঊর্ধ্বে এক জটিল ঐতিহাসিক সমীকরণ

বর্গি হামলাকে কেবল ধর্মীয় সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মারাঠারা যেমন বিহারি ও হিন্দু বাঙালিদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে, তেমনি তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হিন্দু-মুসলিম মিত্রতারও উদাহরণ ছিল। 'মহারাষ্ট্র পুরাণ' অনুযায়ী, দেবী দুর্গা খোদ মারাঠাদের ওপর রুষ্ট হয়েছিলেন কারণ তারা ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবদের ওপরও চড়াও হয়েছিল।

অন্যদিকে, নবাব আলীবর্দী খাঁ-র অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছিল। বিশেষ করে ১৭৪৮ সালে নবাবের বাহিনীর পাঠান সৈন্যরা বিদ্রোহ করে পাটনা দখল করে নেয়, যা বর্গিদের জন্য লুণ্ঠনের পথ আরও সুগম করে দেয়। ভৌগোলিক বিচারে দেখা যায়, গঙ্গা-ভাগীরথী নদীপথই ছিল তখন একমাত্র বাধা, যা পূর্ব বাংলাকে এই বিভীষিকা থেকে অনেকাংশে রক্ষা করেছিল।

উপসংহার: ভবিষ্যতের জন্য একটি চিন্তাশীল প্রশ্ন

১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত চলা এই দশ বছরের ধ্বংসযজ্ঞের অবসান ঘটে এক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে। যার ফলে নবাব আলীবর্দী খাঁ ওড়িশা প্রদেশটি মারাঠাদের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এই এক দশকের অরাজকতা কেবল বাংলার মানচিত্রই বদলায়নি, বরং বাংলার মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী বিভীষিকার জন্ম দিয়েছিল।

আজ যখন আমরা আমাদের পরিচিত সংস্কৃতি বা ঘুমপাড়ানি গানের সুর শুনি, তখন মনে প্রশ্ন জাগে—আমাদের সংস্কৃতির গভীরে আর কতশত এমন ভুলে যাওয়া করুণ ইতিহাস লুকিয়ে আছে? যা হয়তো আজ সুরের ছন্দে মিশে আছে, কিন্তু তার পেছনের হাজারো মানুষের আর্তনাদ আমরা সময়ের ব্যবধানে ভুলে গিয়েছি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

  গাছতলার মেয়েটি আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও...