শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

পুনর্মিলন । অলৌকিক গল্প

 

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। মকবুল যখন সদর দরজা খুলে বাইরে পা বাড়ালেন, তখন চারপাশ নিঝুম। তার পিঠে একটা ধূসর চাদর জড়ানো, চোখ জুড়ে শূন্যতা। গত দুটো বছর যেন এই বাড়িটা এক জীবন্ত নরক হয়ে উঠেছে তার কাছে। প্রথমে একমাত্র ছেলে রনির পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু, আর সেই শোক সহ্য করতে না পেরে ঠিক ছ-মাসের মাথায় স্ত্রী রাবেয়ার চলে যাওয়া— পরপর দুটো আঘাত মকবুলকে আক্ষরিক অর্থেই পাথর করে দিয়েছিল। সংসারের বাকি মানুষেরা তার এই চুপচাপ বেরিয়ে যাওয়া দেখেও কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি। তারা ভেবেছিল, হয়তো মনের ব্যাকুলতায় একটু নদীর পাড় থেকে ঘুরে আসবেন। কিন্তু বেলা গড়িয়ে দুপুর বারোটা ছুঁইছুঁই হলেও যখন মকবুল ফিরলেন না, তখন চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু হলো। বেশিদূর যেতে হয়নি। গ্রামের শেষ প্রান্তে, ঝাউগাছের ছায়ায় ঘেরা পুরোনো গোরস্থানটার ভেতরেই পাওয়া গেল তাকে। কিন্তু সেখানে যে দৃশ্য অপেক্ষা করছিল, তা দেখে উপস্থিত সবার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। মকবুল শুয়ে আছেন রনি আর রাবেয়ার পাশাপাশি দুটো কবরের মাঝখানের খালি জায়গাটুকুতে। তার বাঁ হাতটা প্রসারিত হয়ে আছে ছেলের সমাধির ওপর, আর ডান হাতটা পরম মমতায় ছুঁয়ে আছে স্ত্রীর কবরের মাটি। তার মুখে কোনো যন্ত্রণার ছাপ নেই, বরং এক অদ্ভুত, অলৌকিক প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে ঠোঁটের কোণে। যেন বহু বছর পর এক তৃপ্তির ঘুম ঘুমিয়েছেন তিনি। কাছে গিয়ে যখন তার দেহ স্পর্শ করা হলো, দেখা গেল শরীর একদম হিম। শুধু একটা জিনিস সবার নজর কাড়ল— তার ডান পায়ের গোড়ালির ঠিক ওপরে একটা গভীর, কালচে ক্ষত চিহ্ন। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে পরে জানা গেল, কোনো এক তীব্র বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়ে তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ বা ডাক্তার— কেউই মেলাতে পারলেন না, এই অঞ্চলের চেনা কোনো সাপের বা পোকার বিষ এতটা মারাত্মক হতে পারে না যা আধঘণ্টার মধ্যে একজন মানুষকে নিঃশব্দে মেরে ফেলতে পারে। গ্রামের সাধারণ মানুষ একে স্রেফ একটা দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা বলে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু আসল সত্যটা বোধহয় লুকিয়ে ছিল অন্য কোথাও, যা কেবল মকবুল নিজেই অনুভব করেছিলেন। সেই রাতে, মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে, মকবুল একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে রনি আর রাবেয়া দাঁড়িয়ে আছে। তাদের শরীর থেকে এক অলৌকিক, মৃদু আলো বেরোচ্ছে। রাবেয়া মকবুলের দিকে হাত বাড়িয়ে চেনা গলায় ডাকল, "অনেক তো একা থাকলে, আর কত কষ্ট পাবে? এবার আমাদের কাছে চলে এসো।" মকবুল কেঁদে উঠে বলেছিলেন, "আমি কীভাবে আসব? আমার যে এখনো সময় হয়নি।" তখন রনি তার ছোট্ট হাত দিয়ে মাটির দিকে ইশারা করে বলেছিল, "তুমি শুধু গোরস্থানে চলে এসো বাবা। পথ দেখানোর জন্য আমরা আমাদের দূতকে পাঠাব।" ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও মকবুলের কানে সেই ডাক বাজছিল। এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন। গোরস্থানের গেট দিয়ে যখন তিনি ভেতরে ঢুকলেন, তখন চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। ঠিক তখনই তিনি দেখতে পেলেন, রনি আর রাবেয়ার কবরের মাঝখান থেকে যেন একটা অদ্ভুত, নীলাভ আলো হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকছে। তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে গেলেন। কবরের পাশে গিয়ে যখন তিনি পরম শান্তিতে শুয়ে পড়লেন, ঠিক তখনই তার ডান পায়ের গোড়ালিতে তীব্র একটা দংশন অনুভব করলেন। অদ্ভুত বিষয় হলো, সেই কামড়ে কোনো জ্বালা ছিল না, কোনো যন্ত্রণা ছিল না। বরং একটা শীতল অনুভূতি তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। কুয়াশার মধ্য থেকে মকবুল স্পষ্ট দেখতে পেলেন, কবরের মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে এক , ডানাওয়ালা সোনালী রঙের এক কাঁকড়া বিছে। তার চোখ দুটো অবিকল মানুষের মতো উজ্জ্বল। কামড় দেওয়ার পর মুহূর্তেই পোকাটি মকবুলের দিকে চেয়ে যেন মাথা নোয়ালো, তারপর আবার মিলিয়ে গেল কবরের গভীরে। মকবুল বুঝলেন, ওটি কোনো সাধারণ বিষাক্ত পোকা ছিল না। ওটি ছিল পরলোক থেকে আসা এক অলৌকিক চাবিকাঠি, যা এই পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ-কষ্টের বন্ধন থেকে তাকে মুক্ত করতে এসেছিল। বিষের নীল স্রোত যখন তার হৃদপিণ্ডে পৌঁছাল, মকবুল তখন চোখ বুজে হাসলেন। বাঁ হাতটা ছেলের কবরে আর ডান হাতটা স্ত্রীর কবরে রেখে তিনি ফিসফিস করে বললেন, "আমি এসে গেছি..." পরপর তিনটে মৃত্যুতে গ্রামবাসী হয়তো হতবাক হয়ে কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি। কিন্তু মকবুলের আত্মা সেদিন তার হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সাথে মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। গোরস্থানের সেই নীরবতা এখনো যেন ফিসফিস করে বলে— কিছু মৃত্যু জীবনের শেষ নয়, বরং এক অলৌকিক পুনর্মিলন।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

লৌহকপাটের ওপারে । বড় গল্প

  লৌহকপাটের ওপারে এক বর্ধমান সেন্ট্রাল জেলের ছয় নম্বর ব্যারাকের সেলটা চাপা গলির মতো সরু। দিনের বেলাতেও ছাদের ছোট্ট ঝাঁঝরিপথে আলো আসত কার্পণ...