ব্যারাকপুরের ওই পুরনো রাস্তাটার একটা নিজস্ব চরিত্র আছে। দুপাশে আকাশছোঁয়া প্রাচীন শিরীষ আর রাধাচূড়ার গাছগুলো ব্রিটিশ আমল থেকে দাঁড়িয়ে। অন্য দিন হলে এই চিলতে ছায়াটার নিচে দাঁড়ালে শান্তিবোধ হতো, কিন্তু আজ দিনটা আলাদা। বাতাস যেন ভারী হয়ে জমে আছে। একটা পাতাও নড়ছে না। আকাশের মুখ গোমড়া, অথচ বৃষ্টির কোনো লক্ষণ নেই। শুধু এক অসহ্য, গুমোট আবহে ছটফট করছে চরাচর।
পর্ণা তার বন্ধুদের বিদায় জানাতে মেইন রোডের মোড়টায় এসে দাঁড়িয়েছিল। অঙ্কিত, সায়ন্তনী আর ঋত্বিক—কলেজের প্রজেক্ট শেষ করে আজ বেশ আনন্দেই ছিল ওরা।
"পরের সপ্তাহে কিন্তু তোদের বাড়িতেই আড্ডা হবে," হাসতে হাসতে বলছিল পর্ণা।
ঠিক তখনই কোনো আওয়াজ নেই, কোনো পূর্বাভাস নেই, যেন এক অদৃশ্য কুঠারের আঘাতে রাস্তার ধারের প্রাচীন শিরীষ গাছটার একটা মস্ত বড়, নিরেট ডাল সটান নেমে এলো ঠিক পর্ণার মাথায়। যেন কোনো এক অদৃশ্য শিকারি লক্ষ্যভেদের নিখুঁত নিশানায় ডালটি ছুড়ে দিল।
মুহূর্তের জন্য থমকে গেল চারপাশ। বন্ধুদের সম্বিৎ ফিরতেই তারা চিৎকার করে উঠল। চারপাশের মানুষজন ছুটে এলো। পর্ণা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। অদ্ভুত বিষয়, অত বড় ডালটা পড়ার পর গাছের বাকি অংশটা বা আশেপাশের অন্য কোনো গাছের পাতা একটুও কাঁপল না। যেন প্রকৃতি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শুধু একটা কাজই করতে এসেছিল।
ঋত্বিক আর অঙ্কিত ধরাধরি করে একটা ট্যাক্সি ডাকল। সায়ন্তনী পর্ণার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। পর্ণার চোখ দুটো খোলা, কপাল বেয়ে রক্ত নামছে, কিন্তু তার মুখে কোনো যন্ত্রণার রেখা নেই। বরং এক অদ্ভুত নিরাসক্ত দৃষ্টি।
গাড়িতে যাওয়ার সময় সায়ন্তনী কাঁদছিল। পর্ণা ফিসফিস করে বলল, "কাঁদছিস কেন রে? আমি তো ঠিক আছি।" অঙ্কিত সামনে থেকে বলল, "তুই একদম কথা বলিস না পর্ণা, আমরা হাসপাতালে পৌঁছে গেছি প্রায়।"
পর্ণা একটু হাসল। বলল, "জানিস, ডালটা যখন পড়ছিল, আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু ওটা গাছের ডাল ছিল না রে।" "মানে? কী বলছিস?" সায়ন্তনী ওর হাতটা চেপে ধরল। "ডালটা পড়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে, একটা কুচকুচে কালো মস্ত বড় ছায়া ওপর থেকে নেমে এল। ঠিক যেন একটা মানুষের হাত। আমাকে চুল ধরে টেনে নিল । ওটা ডাল ছিল না... ওটা একটা হাত..."
পর্ণার গলা জড়িয়ে আসছিল। কিন্তু তার কথা বলার মধ্যে কোনো অসংলগ্নতা বা প্রলাপের ছোঁয়া ছিল না। মনে হচ্ছিল সে যা দেখেছে, পরম শান্তিতে সেটাই বর্ণনা করছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর ঠিক দু-মিনিট আগে পর্ণা চোখ বোজে। ডাক্তাররা সব চেষ্টা করেও তাকে আর বাঁচাতে পারেননি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ আর ইন্টারনাল ইনজুরির কারণে তার মৃত্যু হয়।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত, যদি না ঘটনার পরদিন এক অদ্ভুত সত্য সামনে আসত।
পর্ণার মৃত্যুর ধাক্কা সামলে উঠতে না পেরে, অঙ্কিত আর ঋত্বিক পরদিন বিকেলে আবার সেই দুর্ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। মনটা বড্ড ভারী ছিল ওদের। কিন্তু সেখানে গিয়ে ওরা যা দেখল, তাতে ওদের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
যে বিরাট ডালটা পর্ণার ওপর পড়েছিল, সেটাকে পুরসভার কর্মীরা রাস্তার পাশে সরিয়ে রেখেছে। কিন্তু গাছটার দিকে তাকাতেই ঋত্বিকের চোখ আটকে গেল।
"অঙ্কিত, একটু ভালো করে দেখ তো..." ঋত্বিকের গলা কাঁপছিল।
পুরনো শিরীষ গাছটার যে অংশ থেকে ডালটা ভেঙে পড়েছে, সেখানে কোনো কাঁচা বা শুকনো ভাঙার দাগ নেই। সাধারণত ডাল ভাঙলে সেখানে কাঠ বা ছালের একটা এবড়োখেবড়ো অংশ চেরা অবস্থায় থাকে। কিন্তু এই গাছটির ক্ষেত্রে, ডালটি যেখানে মূল কাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিল, সেখানে কাঠ মসৃণ, কালচে এবং এমনভাবে কাটা—যেন কোনো অতিপ্রাকৃতিক করাত দিয়ে নিখুঁত মাপে কেটে আলাদা করা হয়েছে বহু বছর আগে! অথচ ডালটি কাল পর্যন্ত গাছের অংশ ছিল, সবুজ পাতা ছিল তাতে।
সবচেয়ে ভয়ানক কাণ্ড ঘটল ঠিক তার পরে। স্থানীয় এক প্রবীণ দোকানদার ওদের দিকে এগিয়ে এলেন। তিনি চশমাটা মুছে বললেন, "তোমরাই কাল ওই মেয়েটার সাথে ছিলে তো? বড় দুঃখের ঘটনা। কিন্তু একটা কথা মাথায় ঢুকছে না বাবা..."
"কী দাদু?" অঙ্কিত জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ গাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন, "এই গাছটার ওই ডালটা তো আজ থেকে তিরিশ বছর আগে, ১৯৯৬ সালের এক কালবৈশাখীতে ভেঙে পড়ে গিয়েছিল। আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম। তারপর থেকে ওই জায়গাটা ওরম ফাঁকাই ছিল। কাল হঠাৎ ওপর থেকে ওই ডালটা কোথা থেকে এলো, আর পড়ল—সেটা কিছুতেই বুঝছি না!"
অঙ্কিত আর ঋত্বিক একে অপরের দিকে তাকাল। পর্ণার শেষ কথাগুলো ওদের কানে বাজতে লাগল: "ওটা গাছের ডাল ছিল না রে... একটা কুচকুচে কালো ছায়া ওপর থেকে নেমে এল..."
তীব্র দাবদাহের মধ্যেও ব্যারাকপুরের সেই তপ্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুই বন্ধুর গা শিউরে উঠল। বিজ্ঞানের কোনো সূত্র, কোনো ব্যাখ্যা বা প্রকৃতির কোনো নিয়ম সেদিন সেই শূন্য থেকে নেমে আসা ডালটার রহস্যের কিনারা করতে পারেনি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.