লৌহকপাটের ওপারে
এক
বর্ধমান সেন্ট্রাল জেলের ছয় নম্বর ব্যারাকের সেলটা চাপা গলির মতো সরু। দিনের বেলাতেও ছাদের ছোট্ট ঝাঁঝরিপথে আলো আসত কার্পণ্য করে, যেন সরকার এখানে আলোও রেশনে দেয়।
সুবর্ণকান্ত ঘোষ — ওরফে সুবর্ণ দা, ওরফে রাঙা ভাই, ওরফে পুলিশের খাতায় আরও তিনটে নাম — সেই সেলের কোণে বসে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুজে থাকত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হত ঘুমাচ্ছে। আসলে সে জেগে থাকত, ভিতরে ভিতরে।
সাত বছর আগে বর্ধমানের বিচারক তার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন — "সুবর্ণকান্ত ঘোষ, তোমাকে দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হল।"
সেদিন সুবর্ণ হেসেছিল। হাসিটা দেখে আদালতে ফিসফাস উঠেছিল। মানুষ ভেবেছিল পাগল, নাকি বেপরোয়া, নাকি নিছক দুর্বৃত্ত যে সাজার ভয় পায় না।
আসলে সে হেসেছিল কারণ দশ বছর তার কাছে কোনো সংখ্যা ছিল না। যে মানুষ বাঁচার কোনো হিসাব রাখে না, তার কাছে দশ বছর বা দশ হাজার বছর একই কথা।
কিন্তু সাত বছরে অনেক কিছু বদলায়।
মানুষও বদলায়।
সুবর্ণর গল্পটা শুরু হয়েছিল আরও আগে — বহু আগে — মেদিনীপুরের এক ছোট্ট গ্রামে, যেখানে মাটি লাল আর আকাশ নীল, কিন্তু মানুষের জীবন ছিল শুধুই ধূসর।
বাবা ছিল না। মানে ছিল, কিন্তু বাবার মতো ছিল না। মদ আর মারামারি নিয়েই তার দিন কাটত। মা ছিল — একটা নিঃশব্দ, ক্লান্ত মহিলা, যে সংসারের ভার বহন করতে করতে একদিন ভার বহন করার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছিল।
সুবর্ণ কখনও পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারেনি। ক্লাস নাইনে উঠে স্কুল ছেড়েছিল। তারপর রাঙামাটি দলের সাথে মিশেছিল — যাদের জীবিকা ছিল ভয় দেখানো, চাঁদা তোলা, কখনো ডাকাতি।
প্রথমবার যখন সে একটা ছুরি হাতে নিয়েছিল, হাত কাঁপছিল। তৃতীয়বারে কাঁপেনি। দশমবারে ছুরিটা মনে হয়েছিল হাতের অংশ।
তিনটি ডাকাতি, একটি অপহরণ, দুটো মারামারির মামলা — এই নিয়ে সুবর্ণকান্ত ঘোষ বর্ধমান কেন্দ্রীয় কারাগারে এসেছিল।
দুই
শাঁওলি সেনগুপ্ত বর্ধমান সেন্ট্রাল জেলের ডেপুটি সুপার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন চার বছর আগে।
সেদিন সকালে জেলের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে সে প্রথমবার ওই লৌহকপাট দেখছিল — বিশাল, জংধরা, অথচ অটল। তখন তার মনে হয়েছিল এই দরজাটা দুটো পৃথিবীকে আলাদা করে রেখেছে।
পরে বুঝেছিল — ভেতর আর বাইরের পার্থক্যটা শুধু দরজায় নয়, মানুষের মাথায়।
শাঁওলি সেনগুপ্তের বয়স তখন বত্রিশ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রিমিনোলজিতে স্নাতকোত্তর, তারপর পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে একটা ছোট মহিলা সংশোধনাগারে, তারপর এখানে।
বাড়িতে মা জিজ্ঞেস করতেন — "আর কতদিন ওই জায়গায় থাকবি? আসামীদের সাথে? ভালো চাকরি কর।"
শাঁওলি হাসত। মাকে বোঝানো কঠিন যে পৃথিবীর সব থেকে কঠিন কাজটা হল একটা অমানুষকে আবার মানুষ বানানো।
সে বিশ্বাস করত — প্রত্যেক অপরাধীর ভিতরে একটা সুযোগের অপেক্ষায় থাকা মানুষ আছে। পরিস্থিতি, ব্যর্থতা, ক্রোধ, অভাব — এগুলো সেই মানুষটাকে ঢেকে দেয়। সেই ঢাকাটা সরাতে পারলেই হয়।
সহকর্মীরা হাসত। "ম্যাডাম দার্শনিক হয়ে গেছেন।"
শাঁওলি পাত্তা দিত না।
সুবর্ণকান্তের সাথে তার প্রথম কথোপকথন হয়েছিল একটা বিচিত্র পরিস্থিতিতে।
সেদিন ব্যারাকে ভোরবেলা হঠাৎ আলোড়ন। একজন বয়স্ক বন্দি — রামকেষ্ট নামে সবাই চিনত তাকে — বুকে ব্যথা নিয়ে মেঝেতে পড়ে গেছে। অন্য বন্দিরা চিৎকার করছে, গার্ডরা দৌড়াচ্ছে।
অনন্যা পৌঁছে দেখল ভিড়ের মাঝে একটা লোক হাঁটু গেড়ে বসে রামকেষ্টর মাথাটা কোলে তুলে নিয়েছে, জামার বোতাম খুলে দিচ্ছে, শান্ত গলায় বলছে — "শ্বাস নাও, কাকা। ধীরে। ভয় নেই।"
লোকটা সুবর্ণকান্ত।
অ্যাম্বুল্যান্স আসার আগের পনেরো মিনিট সে রামকেষ্টর পাশে থেকে তাকে স্থির রেখেছিল।
পরে শাঁওলি ডেকে পাঠিয়েছিল তাকে।
"তুমি জানতে কীভাবে কী করতে হয়?"
সুবর্ণ মাথা নিচু করে বলেছিল, "জানি না ম্যাডাম। মনে হল চেষ্টা করাটা দরকার।"
শাঁওলি তাকে মাথা তুলে কথা বলতে বলল।
সুবর্ণ মাথা তুলল। প্রথমবার সে সরাসরি তার দিকে তাকাল।
চোখদুটো অদ্ভুত। অন্য জেল-বাসিন্দার চোখে শাঁওলি দেখেছিল — ক্রোধ, নিস্পৃহতা, বা ভয় — সুবর্ণর চোখে তার কিছুই নেই। শুধু একটা গভীর, নিঃসঙ্গ শান্তি।
যেন অনেক আগেই সে কোনো ঝড়ের সাথে লড়াই করা ছেড়ে দিয়েছে।
তিন
তারপর থেকে শাঁওলি লক্ষ্য করত।
অন্য বন্দিদের সাথে সুবর্ণর ব্যবহার দেখত। সে কারো সাথে ঝগড়া করত না, কিন্তু অন্যের ঝগড়া থামাত। ব্যারাকে নতুন কেউ এলে — ভয়ে কাঁপতে থাকা তরুণ, বা আতঙ্কে পাগল হয়ে যাওয়া মধ্যবয়স্ক — সুবর্ণ চুপচাপ তাদের পাশে গিয়ে বসত। কথা বলত না বেশি। শুধু থাকত।
জেলের লাইব্রেরিতে সে যেতে শুরু করেছিল বছর পাঁচেক আগে। প্রথমে অভিধান, তারপর ইতিহাস, তারপর সাহিত্য। গার্ডরা বলত, সুবর্ণ দা সারারাত বালবের আলোয় বই পড়ে।
একদিন শাঁওলি লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখল সে রবীন্দ্রনাথের 'গোরা' পড়ছে।
"কেমন লাগছে?"
সুবর্ণ চমকে উঠল। তারপর বলল, "জটিল। মানুষটা নিজেকে খুঁজছে। নিজেই জানে না সে কে।"
"তোমার নিজের মতো?"
কথাটা বেরিয়ে গেল শাঁওলির মুখ থেকে। বলার পরে নিজেই একটু সংকুচিত হল।
কিন্তু সুবর্ণ রাগ করল না। একটু ভাবল। তারপর বলল, "হয়তো। তবে গোরা মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে ছিল। আমি জানতাম আমি কী করছি।"
"তাহলে?"
"তাহলে হয়তো গোরার চেয়ে আমার ফেরার পথটা কঠিন।"
সেদিনের পর শাঁওলির মাথায় কথাটা থেকে গিয়েছিল।
ফেরার পথ।
সে ফিরতে চাইছে।
কয়েক মাস পরে জেলের ভেতরে একটা শিক্ষাকেন্দ্র খুলল। শাঁওলির উদ্যোগে। বাইরে থেকে একজন শিক্ষক আসতেন, বন্দিদের পড়াতেন — বাংলা, ইংরাজি, গণিত। যারা পরীক্ষা দিতে চায় তাদের জন্য নথিপত্রও করা হত।
সুবর্ণ সেই কেন্দ্রে গেল না।
কিন্তু সাতদিন পরে এল।
সেদিন শিক্ষক অসুস্থ। ক্লাস হবে না — এই কথা শুনে যখন তরুণ বন্দিরা হতাশ মুখে ফিরে যাচ্ছিল, সুবর্ণ হঠাৎ বলল, "আমি পড়াতে পারি।"
গার্ড অবাক হয়ে শাঁওলিকে ফোন করল।
শাঁওলি এল। দরজা থেকে দাঁড়িয়ে দেখল — সুবর্ণ একটা বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে, গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করেছে। হাতের লেখা যত্নশীল। বোর্ডে সে লিখছে একটা কবিতার লাইন।
"যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।"
তারপর বলল, "এই লাইনটা শুধু অন্যদের জন্য না। নিজের জন্যও।"
ক্লাসের ভেতর দশজন কঠিন মুখের মানুষ চুপ করে শুনছে।
শাঁওলি চোখ ফেরাতে পারল না।
চার
সময় এগিয়ে চলল।
শাঁওলি নিজেকে বোঝাত — এটা পেশাদার আগ্রহ। একটা কেস স্টাডি। একজন অপরাধীর সংশোধনের প্রক্রিয়া দেখা। এটাই তার কাজ।
কিন্তু নিজেকে মিথ্যা বলা যায় কতক্ষণ?
সে খেয়াল করত সুবর্ণর হাত দুটো। যে হাত একসময় ছুরি ধরত, সেই হাত এখন বই ধরে যত্নে, যেন বই ভেঙে যাবে। সে খেয়াল করত যে সে কথা বলার সময় অন্যের দিকে সোজাসুজি তাকায়, কখনো চোখ সরায় না। সে খেয়াল করত যে জেলের উঠোনে বিকেলের আলো পড়লে সে একা বসে থাকে, আকাশের দিকে তাকিয়ে — যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো জিনিসের কথা ভাবে।
একদিন সে সাহস করে জিজ্ঞেস করল, "কী ভাবো ওইভাবে?"
সুবর্ণ বলল, "মা।"
"মা কোথায়?"
"মারা গেছেন। আমার জেলে আসার তিন বছর পরে।" একটু থামল। "খবর পেয়েছিলাম চিঠিতে। ভাই লিখেছিল। তারপর আর কোনো চিঠি আসেনি।"
শাঁওলি কিছু বলতে পারল না।
"ম্যাডাম জানেন," সুবর্ণ বলল, "মায়ের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল গ্রেফতারের দিন। কাঁদছিল। আমি ভেবেছিলাম কষ্টের জন্য কাঁদছে। পরে বুঝেছি লজ্জার জন্য কাঁদছিল। ছেলের জন্য লজ্জা।"
গলা একটু ভাঙল তার।
"সেই লজ্জাটা দিয়ে যাওয়াটা আমি কোনোদিন ফেরাতে পারব না।"
সেই রাতে শাঁওলি বাড়িতে বসে বুঝতে পারল সে কোথায় পৌঁছে গেছে।
এটা পেশাদারিত্ব নয়। এটা সহানুভূতিও নয়।
এটা অন্য কিছু। অনেক বেশি বিপজ্জনক।
সে ডায়েরিতে লিখল:
"আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?"
লেখার পরে আবার কেটে দিল।
পাঁচ
বছর ঘুরল।
সুবর্ণর নাম উঠল ভালো আচরণের তালিকায়। জেল কর্তৃপক্ষ সুপারিশ করল সাজা লঘু করার। ফাইল গেল আদালতে।
শাঁওলি সেই ফাইলে সই করল।
সই করার সময় হাত কাঁপছিল। সে বুঝতে পারছিল না — ভয়ে, না অন্য কারণে।
রায় এল তিন মাস পরে। দশ বছরের সাজা কমে হল সাত বছর। আর তিন মাস পরে সুবর্ণকান্ত ঘোষ মুক্ত।
মুক্তির আগের রাতে শাঁওলি তাকে ডেকে পাঠাল।
সরকারি নিয়ম। মুক্তি পাওয়া বন্দিদের একটা প্রি-রিলিজ কাউন্সেলিং হয়। কোথায় যাবে, কী করবে, কোনো পরিচিত আছে কিনা।
কিন্তু সেদিনের কথাগুলো কাউন্সেলিং ছিল না।
শাঁওলি বলল, "কোথায় যাবে?"
"জানি না।"
"গ্রামে ফিরবে?"
"না। ভাই আর পরিচয় দিতে চায় না। গ্রামে মুখ দেখাব কীভাবে?"
"তাহলে?"
"কলকাতায় যাব। কোনো কাজ পাব। সৎভাবে বাঁচার চেষ্টা করব।"
একটু চুপ থেকে সুবর্ণ বলল, "ভয় লাগছে, ম্যাডাম। ভেতরে থাকতে ভয় লাগত না। বাইরে যেতে লাগছে।"
"কেন?"
"ভেতরে জানি কী হবে। বাইরে জানি না।" একটা ক্লান্ত হাসি। "আর ভেতরে... অন্তত কথা বলার মানুষ ছিল।"
কথাটা বলেই সুবর্ণ থামল। চোখ নামিয়ে নিল।
শাঁওলি বুঝল সে কী বলতে চাইছে।
বুকের ভেতরে একটা টান।
সে বলল, "সুবর্ণ।"
"ম্যাডাম?"
"আমি... আমি চাই তুমি ভালো থাকো।"
"জানি।"
"শুধু সেটুকু নয়।" গলাটা একটু কাঁপল। "তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। তোমাকে দেখতে... ভালো লাগে।"
নিস্তব্ধতা।
সুবর্ণ মাথা তুলে তাকাল।
শাঁওলি বলল, "আমি জানি এটা ঠিক না। আমি তোমার অফিসার। তুমি একজন বন্দি। কিন্তু কাল তুমি মুক্ত হয়ে যাচ্ছ। তারপর... তারপর আমরা শুধু দুটো মানুষ।"
সুবর্ণ অনেকক্ষণ কিছু বলল না।
তারপর ধীরে ধীরে বলল, "ম্যাডাম, আমি একজন অপরাধী ছিলাম।"
"ছিলাম।"
"আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।"
"ভবিষ্যৎ থাকে না, বানাতে হয়।"
আরেকটু নিস্তব্ধতা।
তারপর সুবর্ণ বলল, "আমি আপনার যোগ্য নই।"
শাঁওলি বলল, "যোগ্যতার সার্টিফিকেট আমি দেব, না তুমি?"
ছয়
পরদিন ভোরে সুবর্ণকান্ত ঘোষ সেই বিশাল লৌহকপাটের সামনে দাঁড়াল।
কাগজপত্র হয়ে গেছে। গেটটা খুলল।
সে বেরিয়ে এল।
রাস্তার ওপারে একটা চায়ের দোকান। রিকশা যাচ্ছে। সাইকেল। একটা গরু ধীরে পার হচ্ছে।
পৃথিবী থেমে থাকেনি।
সে আকাশের দিকে তাকাল। নীল। ঠিক আগের মতোই নীল।
পিছনে পায়ের আওয়াজ।
ঘুরে দেখল — শাঁওলি।
অফিসার ইউনিফর্মে নয়। সাদা শাড়িতে। একটু অস্বস্তিতে। যেন সে নিজেও জানে না কেন এসেছে।
"কফি খাবে?" সে বলল।
সুবর্ণ হাসল। সেই হাসিতে সাত বছর ছিল, সাত বছরের ক্লান্তি ছিল, এবং তার পাশাপাশি — অনেক দিন পরে — একটুকরো আলো।
"খাব।"
সাত
এরপর একটা বছর।
সহজ ছিল না। মোটেই না।
প্রথমে সুবর্ণ কলকাতায় একটা ছাপাখানায় কাজ পেল। ছোট কাজ, কম মাইনে। কিন্তু সৎ। সে ভাড়া ঘর নিল। একা থাকত। রান্না শিখল।
শাঁওলির সাথে যোগাযোগ রইল — প্রথমে সাবধানে, দূরত্ব রেখে। ফোনে কথা। মাঝে মাঝে দেখা।
কিন্তু দুজনেই জানত।
শাঁওলির মা জানলে ঝড় উঠল। "একজন জেলফেরত মানুষ? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?"
শাঁওলি শান্তভাবে বলল, "মা, মানুষটাকে একবার দেখো।"
সুবর্ণর ভাই জানল। ফোনে বলল, "তোর লজ্জা নেই? একজন অফিসারকে জড়াচ্ছিস?"
সুবর্ণ বলল, "সে আমাকে জড়িয়েছে।"
সহকর্মীরা কানাঘুষো করল। শাঁওলি চুপ থাকল।
একদিন তার সুপারিন্টেনডেন্ট ডেকে বললেন, "এই সম্পর্কটা তোমার কেরিয়ারের পক্ষে ভালো না।"
শাঁওলি বলল, "স্যার, ভালো কেরিয়ারের জন্য আমি কি ভালো মানুষকে ছেড়ে দেব?"
একটা সন্ধ্যায় ময়দানে বসেছিল দুজনে। শীতের শুরু। অন্ধকার নামছে।
সুবর্ণ বলল, "তুমি কি কখনো ভয় পাও?"
"কীসে?"
"আমাকে নিয়ে। আমার অতীত নিয়ে।"
শাঁওলি একটু ভাবল।
"অতীত নিয়ে ভয় পাই না। অতীত তো সত্যি। সত্যিকে ভয় পেলে চলে না।"
"তাহলে কী নিয়ে ভয়?"
"ভয় পাই যদি তুমি নিজেকে ছোট মনে করো। যদি মনে করো তুমি এটার যোগ্য নও।"
সুবর্ণ চুপ করে থাকল।
শাঁওলি বলল, "রত্নাকর ডাকাত বাল্মীকি হয়েছিল। কিন্তু বাল্মীকির গল্পে কেউ সীতার কথা বলে না।"
"মানে?"
"মানে বাল্মীকির জীবনে যে মানুষটা এসেছিল, যে তাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল সে বদলাতে পারে — সে কে ছিল? সেও কেউ ছিল। হয়তো তার গল্পটাও ছিল।"
সুবর্ণ ধীরে ধীরে হাসল।
"তুমি কি সেটা হতে চাও?"
"আমি তোমার সাথে থাকতে চাই। বাকি গল্পটা একসাথে লিখতে চাই।"
আট
বিয়েটা হল খুব সাদামাটাভাবে।
রেজিস্ট্রি অফিসে। দুটো সাক্ষী — শাঁওলির এক বান্ধবী, আর ছাপাখানার সুবর্ণর এক সহকর্মী। মা এলেন না। ভাই এল না।
কিন্তু বেরিয়ে আসার সময় রোদ ছিল।
সুবর্ণ কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল।
"কী হল?" শাঁওলি জিজ্ঞেস করল।
"ভাবছি।"
"কী?"
"এই কাগজটায় আমার নাম লেখা। সুবর্ণকান্ত ঘোষ। আর তোমার নাম। একসাথে।" গলা একটু ভাঙল। "এত বছর আমার নাম ছিল ফাইলে, চার্জশিটে, ব্যারাকের তালিকায়। এই প্রথম কোনো ভালো কাগজে।"
শাঁওলি তার হাত ধরল।
সুবর্ণ বলল, "তুমি কি ভয় পাচ্ছ ?"
"না।"
"কেন?"
"কারণ তুমিও পাচ্ছো না।"
নয়
তাদের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট হল দক্ষিণ কলকাতায়।
শাঁওলি সকালে জেলে যায়। বিকেলে ফেরে। সুবর্ণ ততদিনে ছাপাখানা ছেড়ে একটা এনজিওতে কাজ পেয়েছিল — কারামুক্ত মানুষদের পুনর্বাসনে সাহায্য করে তারা। সুবর্ণর অভিজ্ঞতা সেখানে সোনার চেয়ে দামি।
একদিন শাঁওলি বাড়ি ফিরে দেখল রান্নাঘরে রান্না হচ্ছে। পাতলা ডাল, আলু ভাজা। সুবর্ণ হাতা নাড়ছে।
"কী রান্না?"
"মায়ের রেসিপি।" একটু থামল। "মনে আছে সব। ভুলিনি।"
শাঁওলি বসে পড়ল খাবারের টেবিলে।
"এনজিওতে আজ একটা ছেলে এসেছিল," সুবর্ণ বলল, "মাত্র আঠারো বছর বয়সে জেলে গিয়েছিল। পাঁচ বছর পরে বেরিয়ে বুঝতে পারছে না কোথায় যাবে। বাড়ি নেই, কাজ নেই।"
"তুমি কী বললে তাকে?"
"বললাম যে শুরুটা সহজ না। কিন্তু এক পা এক পা করে এগোতে হয়। প্রতিটা ভালো কাজ আগের একটা খারাপকে একটুখানি ঢেকে দেয়। সব ঢাকা পড়বে না কোনোদিন। কিন্তু নতুন গল্পটা শুরু হয়।"
শাঁওলি তাকাল।
"তুমি নিজেকে দেখছ ওই ছেলেটার মধ্যে?"
"সবসময়।"
সে থালায় ভাত দিল।
"আর আমাকে দেখছ?"
সুবর্ণ হাসল। "সেই ম্যাডামকে দেখছি যে আমাকে মাথা তুলে কথা বলতে বলেছিল।"
দশ
বছর ঘুরল।
শাঁওলির মা একদিন এলেন। বিনা নোটিশে।
দরজা খুলল সুবর্ণ।
মহিলা তাকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখলেন। সুবর্ণ একটু পিছিয়ে গেল।
"ভেতরে আসতে বলবে না?" মহিলা বললেন।
"আসুন।"
তিনি ঢুকলেন। ঘরটা দেখলেন। পরিষ্কার। সাজানো। দেয়ালে একটা ছোট্ট তাক, তাতে কয়েকটা বই।
"শাঁওলি নেই?"
"অফিসে। সন্ধ্যায় আসবে।"
মহিলা সোফায় বসলেন। চুপ।
সুবর্ণ জিজ্ঞেস করল, "চা করব?"
"করো।"
রান্নাঘরে চা বানাতে বানাতে সুবর্ণর হাত কাঁপছিল। এই মহিলাকে সে ভয় পায় না। কিন্তু তার জন্য দুঃখ লাগে। মেয়ে তার কাছ থেকে কতটা দূরে সরে গেছে।
চা দিয়ে সামনে বসল।
মহিলা চায়ের কাপে চোখ রেখে বললেন, "তুমি কি আমার মেয়েকে সুখী রাখতে পারবে?"
"চেষ্টা করব। প্রতিদিন।"
"তোমার অতীত?"
"সেটা থাকবেই। পাল্টানো যাবে না। কিন্তু সেই অতীতের কারণে বর্তমানকে আমি নষ্ট করতে দেব না।"
মহিলা চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন, "শাঁওলির বাবা মারা গেছে যখন, সে দশ বছরের। তারপর থেকে সে একা লড়াই করেছে সবসময়। ভালোবাসার জন্য কখনো কারো কাছে হাত পাতেনি।"
চোখটা একটু ভিজল তাঁর।
"এই প্রথম সে হাত পাতল।"
সুবর্ণ কিছু বলল না।
মহিলা বললেন, "সেই হাতটা ধরে রেখো।"
সন্ধ্যায় শাঁওলি বাড়ি ঢুকে দেখল মা আর সুবর্ণ একসাথে বসে টিভিতে সিরিয়াল দেখছে। মা কিছু একটা বলছেন, সুবর্ণ মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে।
শাঁওলি দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল।
বুকের ভেতরে কী একটা নরম হয়ে গেল।
এক বছর পরে।
বর্ধমান সেন্ট্রাল জেলে সেদিন একটা অনুষ্ঠান।
সংশোধনাগারের নতুন একটা শিক্ষাকার্যক্রম চালু হচ্ছে — যেখানে জেলমুক্ত মানুষেরা এসে বর্তমান বন্দিদের সাথে কথা বলবে। তাদের নিজের গল্প বলবে।
প্রথম বক্তা সুবর্ণকান্ত ঘোষ।
সে সেই লৌহকপাট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল — এবার স্বেচ্ছায়।
ব্যারাকের উঠোনে পাঁচশো বন্দি। বিভিন্ন বয়স। বিভিন্ন মামলা। বিভিন্ন চোখের ভাষা।
সুবর্ণ মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল।
"আমি এখানে এসেছিলাম বন্দি হয়ে। আজ এসেছি মানুষ হয়ে।"
ভিড়ের মধ্যে কেউ একটু নড়ল।
"জেলের ভেতরে থেকে মনে হয় বাইরের পৃথিবী অনেক দূরে। হয়তো হাতের নাগালের বাইরে। কিন্তু আমি বলছি — বাইরের পৃথিবীটা এখানেও আছে। তোমার ভেতরে আছে। সেটাকে বাঁচিয়ে রাখো।"
সে একটু থামল।
"আমি ডাকাত ছিলাম। মানুষকে ভয় দেখিয়েছি। কষ্ট দিয়েছি। সেটা মুছে যাবে না। কিন্তু আমি এখন ছাপাখানায় শ্রমিকদের সাথে কাজ করি। জেলফেরত মানুষদের পুনর্বাসনে সাহায্য করি। এবং..." একটু থামল, "আমার একজন জীবনসাথী আছে, যে আমার মধ্যে আমার চেয়ে বেশি বিশ্বাস রেখেছিল।"
পিছনের সারিতে শাঁওলি দাঁড়িয়ে ছিল। ইউনিফর্মে। কিন্তু আজ তার চোখে শুধু অফিসার নয়, একজন মানুষ।
সুবর্ণ সামনের সারির একটি তরুণের দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে সেই পুরনো নিস্পৃহতা। সুবর্ণ চেনে সেই চোখ। আয়নায় দেখেছিল।
"তুমি কতটা ভেঙে পড়েছ, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল এরপরও উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছাটুকু আছে কিনা। সেটুকু থাকলেই হয়। বাকিটা আসে।"
ছেলেটার চোখ একটু পাল্টাল।
একটুকরো আলো।
সেদিন বিকেলে ফেরার পথে সুবর্ণ আর শাঁওলি সেই লৌহকপাটের সামনে দাঁড়াল।
সুবর্ণ পিছন ফিরে তাকাল।
"কী ভাবছ?" শাঁওলি জিজ্ঞেস করল।
"ভাবছি সাত বছর আগে এই দরজা দিয়ে ঢুকেছিলাম। মনে হয়েছিল জীবন শেষ।"
"আর এখন?"
সুবর্ণ তার হাত ধরল।
"এখন মনে হচ্ছে শুরু।"
শাঁওলি একটু হাসল।
লৌহকপাটের ওপারে সূর্য ডুবছিল। আকাশে কমলা আভা। সেই আলোয় দুটো মানুষ — একজন যে ভেঙে পড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, একজন যে হাত ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছে — হেঁটে চলল।
লৌহকপাট পিছনে রইল।
সামনে রইল পথ।
লৌহকপাট বন্ধ করে না সবসময়। কখনো কখনো সেই ভারী দরজার ওপারেই লুকিয়ে থাকে নতুন জীবনের চাবিকাঠি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.