অজয় নদের তীরে বিস্মৃত ইতিহাস: মঙ্গলকোটের রহস্যময় জগতের ৫টি বিশেষ প্রাপ্তি
১. ভূমিকা: সময়ের স্রোত যেখানে স্থির হয়ে আছে
বাংলার মাটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের না বলা মহাকাব্য। বর্ধমান জেলার বৃহত্তম প্রত্ন-সমৃদ্ধ অঞ্চল মঙ্গলকোট এমনই এক বিস্ময়কর জনপদ। কলকাতা থেকে প্রায় ১৩২ কিলোমিটার দূরে, যেখানে অজয় ও কুনুর নদী একে অপরের সঙ্গে মিতালি করেছে, সেখানেই ইতিহাসের এক সুবিশাল ভাণ্ডার আগলে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন স্থানটি। বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্রেও এই জনপদের সগৌরব উল্লেখ পাওয়া যায়। আজ যেখানে শান্ত, নিঝুম গ্রাম্য পরিবেশ, সেখানে একসময় ছিল কোলাহলপূর্ণ নগরী আর বাণিজ্যের ব্যস্ততা। একজন ঐতিহ্য সন্ধানী হিসেবে যখনই এই মাটির স্তরে চোখ রাখি, মনে হয় সময়ের স্রোত যেন এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। ৩০০০ বছরের নীরব সাক্ষী এই মঙ্গলকোট কেবল মাটির ঢিবি নয়, বরং আমাদের শিকড়ের এক অকাট্য দলিল।
২. প্রথম টেকঅ্যাওয়ে: ৩০০০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন সভ্যতার ইতিহাস
মঙ্গলকোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হলো এর নিরবচ্ছিন্ন জনবসতি। নদীমাতৃক বাংলায় বন্যার প্রকোপে সাধারণত জনপদগুলো বারবার ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফলে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। কিন্তু মঙ্গলকোটের উচ্চতা ও ভৌগোলিক অবস্থান একে রক্ষা করেছে। এখানে তাম্রপ্রস্তর যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দ) থেকে শুরু করে মোগল আমল পর্যন্ত প্রায় ৩০০০ বছর ধরে মানুষ একটানা বসবাস করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানে 'পাণ্ডু রাজার ঢিবি'র সমসাময়িক সংস্কৃতির প্রমাণ পেয়েছেন।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের পর্যায়ক্রমিক স্তরগুলো নিম্নরূপ:
- তাম্রপ্রস্তর যুগ (Chalcolithic): ১০০০-৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এই স্তরে 'Black-and-red ware' বা কালো-লাল মৃৎপাত্র এবং প্রাচীন ধান চাষের (Rice cultivation) অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।
- মৌর্য-শুঙ্গ আমল: খ্রিস্টপূর্ব ৩য় থেকে ১ম শতক। উত্তরের কালো মসৃণ মৃৎপাত্র (NBPW) এবং ঢালাই করা তাম্রমুদ্রা এই সময়ের নাগরিক বিকাশের সাক্ষ্য দেয়।
- কুশান আমল: ১ম থেকে ৩য় খ্রিস্টাব্দ। এ সময় স্থাপত্যে পোড়া ইটের ব্যবহার এবং শিল্পকলার ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
- গুপ্ত যুগ: ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ খ্রিস্টাব্দ। মঙ্গলকোটের বৈভব এই সময়ে শিখরে পৌঁছায়, যার প্রমাণ মেলে সুক্ষ্ম মৃৎপাত্র ও সিলমোহরে।
- মধ্যযুগ ও মোগল আমল: সুলতানি ও মোগল আমলের মুদ্রা ও স্থাপত্য প্রমাণ করে যে, মঙ্গলকোট তখন একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল।
৩. দ্বিতীয় টেকঅ্যাওয়ে: 'আঠারো আওলিয়ার স্থান' ও ধর্মীয় সম্প্রীতির মেলবন্ধন
মঙ্গলকোটকে স্থানীয়ভাবে 'আঠারো আওলিয়ার স্থান' বলা হয়। মধ্যযুগে এখানে ইসলাম ধর্মের সুফি সাধকদের আগমনের ফলে এক অনন্য সাংস্কৃতিক সংশ্লেষ তৈরি হয়েছিল। হাজি ফিরোজ, সৈয়দ শাহ তাজউদ্দীন, মকদুম বিলায়েৎ ও আবদুল্লাহ গুজরাটীর মতো সাধকদের স্মৃতি আজও এই জনপদকে পবিত্র করে রেখেছে। এখানে পীর ও আওলিয়াদের দরগাহের পাশাপাশি বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের নিদর্শনের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, মঙ্গলকোট ছিল উদার ধর্মীয় সহাবস্থানের পীঠস্থান। 'পীর পঞ্জতন'-এর সমাধি আসলে পাঁচজন গাজীর স্মৃতিধন্য স্থান, যা আজও হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
এখানকার বীরত্বগাথা ও লোককাহিনীতে গাজীদের লড়াই এক বিশেষ অধ্যায়। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুসারে:
"মঙ্গলকোটে বিক্রমজিৎ নামে এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা রাজা ছিলেন। সেই সময় সতেরো জন মতান্তরে আঠারো জন গাজী মঙ্গলকোট দখল করতে আসেন। ধর্মযুদ্ধে গাজীরা একে একে শাহাদাত বরণ করেন। শেষ পর্যন্ত 'গজনবী' নামে এক গাজী মঙ্গলকোট জয় করেন।"
৪. তৃতীয় টেকঅ্যাওয়ে: সম্রাট শাহজাহান ও মঙ্গলকোটের রাজকীয় যোগসূত্র
মোগল ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায় মঙ্গলকোটের মাটির সাথে মিশে আছে। মোগল সম্রাট শাহজাহান যখন বিদ্রোহী যুবরাজ (Prince Khurram) হিসেবে পিতা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে লড়াই করে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, তখন তিনি বাংলার এই নিভৃত প্রান্তে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখানেই তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে প্রখ্যাত পণ্ডিত ও সুফি সাধক মাওলানা হামিদ দানিশমান্দ-এর সাথে। সম্রাটের সেই দুঃসময়ে এই জ্ঞানতাপসের সান্নিধ্য তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তীতে সম্রাট হয়ে শাহজাহান তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ১৬৫৪ সালে এখানে একটি অপূর্ব মসজিদ নির্মাণ করেন, যা 'শাহজাহানি মসজিদ' নামে পরিচিত। এই চত্বরে আজও মোগল আমলের আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে 'নকড়া খানা' ও 'হাম্মাম খানা'-র ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়।
৫. চতুর্থ টেকঅ্যাওয়ে: 'বিক্রমাদিত্যের ডাঙা' ও কিংবদন্তির হাতছানি
মঙ্গলকোটের সবচেয়ে উঁচু ও প্রধান ঢিবিটি স্থানীয়ভাবে 'বিক্রমাদিত্য ঢিবি' বা 'বিক্রমাদিত্যের ডাঙা' নামে পরিচিত। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এখানে যে খননকার্য চালায়, তাতে ইতিহাসের বহু অজানা দিক উন্মোচিত হয়। এই উৎখননে গুপ্ত যুগের বিশাল ইটের তৈরি কাঠামো, প্রাচীন সিলমোহর এবং বিরল 'সর্প-ফণাধারী নারী মূর্তি' (female figures with snake-hoods) পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া এখানে গুপ্ত যুগের একটি দিগম্বর জৈন তীর্থঙ্কর মূর্তি পাওয়া গেছে যা এই জনপদের প্রাচীন ধর্মীয় সমৃদ্ধির সাক্ষ্য দেয়। কিংবদন্তি আর প্রত্নতত্ত্বের এই মেলবন্ধন মঙ্গলকোটকে পর্যটকদের কাছে এক রহস্যময় আকর্ষণে পরিণত করেছে।
৬. পঞ্চম টেকঅ্যাওয়ে: প্রাচীন বাংলার অন্যতম বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ কেন্দ্র
মঙ্গলকোট যে কেবল একটি ধর্মীয় বা প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না, বরং জল ও স্থলপথে ভারতের অন্যান্য প্রান্তের সাথে যুক্ত একটি বিশাল বাণিজ্যিক হাব ছিল, তার প্রমাণ মেলে ভূগোলে। অজয় ও কুনুর নদের নাব্যতা তখন এতটাই বেশি ছিল যে বড় বড় জাহাজ অনায়াসেই যাতায়াত করত। মঙ্গলকোটের প্রতিবেশী 'উজানিনগর' ছিল মনসামঙ্গল কাব্যের চাঁদ সওদাগরের আবাসভূমি। বাণিজ্য শেষে তাঁর 'সপ্তডিঙ্গা নৌকা' এই পথেই ফিরত। শুধু জলপথ নয়, বিখ্যাত 'বাদশাহী সড়ক' (Badshahi Sarak) মঙ্গলকোটের ওপর দিয়েই গৌড় থেকে ওড়িশার কটক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই সড়কই মঙ্গলকোটকে সেকালের উত্তর ভারতের সাথে সরাসরি যুক্ত করেছিল।
৭. উপসংহার: বর্তমানের আয়নায় অতীত
মঙ্গলকোটের ৩০০০ বছরের এই ইতিহাস আমাদের আত্মপরিচয়ের দর্পণ। একসময় যে জনপদ সম্রাট, সাধক আর বিশ্বখ্যাত বণিকদের পদচারণায় মুখরিত ছিল, আজ তা যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অবহেলিত। তবে আশার কথা এই যে, ২০১৫ সালে 'মঙ্গলকোট গভর্মেন্ট কলেজ' প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নবীন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্যকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমাদের ঐতিহ্যের এই অমূল্য সম্পদগুলো কেবল মাটির ঢিবি হয়ে পড়ে থাকুক, তা কারোরই কাম্য নয়।
পরিশেষে একটি চিন্তাশীল প্রশ্ন রেখে যাই— "আমাদের পায়ের নিচের এই ৩০০০ বছরের গৌরবময় ইতিহাস কি শুধুই ধুলোবালি, নাকি আমাদের শেকড়ের আসল পরিচয়?" এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.