শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

লৌহকপাটের ওপারে । বড় গল্প

 




লৌহকপাটের ওপারে

এক
বর্ধমান সেন্ট্রাল জেলের ছয় নম্বর ব্যারাকের সেলটা চাপা গলির মতো সরু। দিনের বেলাতেও ছাদের ছোট্ট ঝাঁঝরিপথে আলো আসত কার্পণ্য করে, যেন সরকার এখানে আলোও রেশনে দেয়।
সুবর্ণকান্ত ঘোষ — ওরফে সুবর্ণ দা, ওরফে রাঙা ভাই, ওরফে পুলিশের খাতায় আরও তিনটে নাম — সেই সেলের কোণে বসে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বুজে থাকত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হত ঘুমাচ্ছে। আসলে সে জেগে থাকত, ভিতরে ভিতরে।
সাত বছর আগে বর্ধমানের বিচারক তার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন — "সুবর্ণকান্ত ঘোষ, তোমাকে দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হল।"
সেদিন সুবর্ণ হেসেছিল। হাসিটা দেখে আদালতে ফিসফাস উঠেছিল। মানুষ ভেবেছিল পাগল, নাকি বেপরোয়া, নাকি নিছক দুর্বৃত্ত যে সাজার ভয় পায় না।
আসলে সে হেসেছিল কারণ দশ বছর তার কাছে কোনো সংখ্যা ছিল না। যে মানুষ বাঁচার কোনো হিসাব রাখে না, তার কাছে দশ বছর বা দশ হাজার বছর একই কথা।
কিন্তু সাত বছরে অনেক কিছু বদলায়।
মানুষও বদলায়।
সুবর্ণর গল্পটা শুরু হয়েছিল আরও আগে — বহু আগে — মেদিনীপুরের এক ছোট্ট গ্রামে, যেখানে মাটি লাল আর আকাশ নীল, কিন্তু মানুষের জীবন ছিল শুধুই ধূসর।
বাবা ছিল না। মানে ছিল, কিন্তু বাবার মতো ছিল না। মদ আর মারামারি নিয়েই তার দিন কাটত। মা ছিল — একটা নিঃশব্দ, ক্লান্ত মহিলা, যে সংসারের ভার বহন করতে করতে একদিন ভার বহন করার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছিল।
সুবর্ণ কখনও পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারেনি। ক্লাস নাইনে উঠে স্কুল ছেড়েছিল। তারপর রাঙামাটি দলের সাথে মিশেছিল — যাদের জীবিকা ছিল ভয় দেখানো, চাঁদা তোলা, কখনো ডাকাতি।
প্রথমবার যখন সে একটা ছুরি হাতে নিয়েছিল, হাত কাঁপছিল। তৃতীয়বারে কাঁপেনি। দশমবারে ছুরিটা মনে হয়েছিল হাতের অংশ।
তিনটি ডাকাতি, একটি অপহরণ, দুটো মারামারির মামলা — এই নিয়ে সুবর্ণকান্ত ঘোষ বর্ধমান কেন্দ্রীয় কারাগারে এসেছিল।
দুই
শাঁওলি সেনগুপ্ত বর্ধমান সেন্ট্রাল জেলের ডেপুটি সুপার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন চার বছর আগে।
সেদিন সকালে জেলের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে সে প্রথমবার ওই লৌহকপাট দেখছিল — বিশাল, জংধরা, অথচ অটল। তখন তার মনে হয়েছিল এই দরজাটা দুটো পৃথিবীকে আলাদা করে রেখেছে।
পরে বুঝেছিল — ভেতর আর বাইরের পার্থক্যটা শুধু দরজায় নয়, মানুষের মাথায়।
শাঁওলি সেনগুপ্তের বয়স তখন বত্রিশ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রিমিনোলজিতে স্নাতকোত্তর, তারপর পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে একটা ছোট মহিলা সংশোধনাগারে, তারপর এখানে।
বাড়িতে মা জিজ্ঞেস করতেন — "আর কতদিন ওই জায়গায় থাকবি? আসামীদের সাথে? ভালো চাকরি কর।"
শাঁওলি হাসত। মাকে বোঝানো কঠিন যে পৃথিবীর সব থেকে কঠিন কাজটা হল একটা অমানুষকে আবার মানুষ বানানো।
সে বিশ্বাস করত — প্রত্যেক অপরাধীর ভিতরে একটা সুযোগের অপেক্ষায় থাকা মানুষ আছে। পরিস্থিতি, ব্যর্থতা, ক্রোধ, অভাব — এগুলো সেই মানুষটাকে ঢেকে দেয়। সেই ঢাকাটা সরাতে পারলেই হয়।
সহকর্মীরা হাসত। "ম্যাডাম দার্শনিক হয়ে গেছেন।"
শাঁওলি পাত্তা দিত না।
সুবর্ণকান্তের সাথে তার প্রথম কথোপকথন হয়েছিল একটা বিচিত্র পরিস্থিতিতে।
সেদিন ব্যারাকে ভোরবেলা হঠাৎ আলোড়ন। একজন বয়স্ক বন্দি — রামকেষ্ট নামে সবাই চিনত তাকে — বুকে ব্যথা নিয়ে মেঝেতে পড়ে গেছে। অন্য বন্দিরা চিৎকার করছে, গার্ডরা দৌড়াচ্ছে।
অনন্যা পৌঁছে দেখল ভিড়ের মাঝে একটা লোক হাঁটু গেড়ে বসে রামকেষ্টর মাথাটা কোলে তুলে নিয়েছে, জামার বোতাম খুলে দিচ্ছে, শান্ত গলায় বলছে — "শ্বাস নাও, কাকা। ধীরে। ভয় নেই।"
লোকটা সুবর্ণকান্ত।
অ্যাম্বুল্যান্স আসার আগের পনেরো মিনিট সে রামকেষ্টর পাশে থেকে তাকে স্থির রেখেছিল।
পরে শাঁওলি ডেকে পাঠিয়েছিল তাকে।
"তুমি জানতে কীভাবে কী করতে হয়?"
সুবর্ণ মাথা নিচু করে বলেছিল, "জানি না ম্যাডাম। মনে হল চেষ্টা করাটা দরকার।"
শাঁওলি তাকে মাথা তুলে কথা বলতে বলল।
সুবর্ণ মাথা তুলল। প্রথমবার সে সরাসরি তার দিকে তাকাল।
চোখদুটো অদ্ভুত। অন্য জেল-বাসিন্দার চোখে শাঁওলি দেখেছিল — ক্রোধ, নিস্পৃহতা, বা ভয় — সুবর্ণর চোখে তার কিছুই নেই। শুধু একটা গভীর, নিঃসঙ্গ শান্তি।
যেন অনেক আগেই সে কোনো ঝড়ের সাথে লড়াই করা ছেড়ে দিয়েছে।
তিন
তারপর থেকে শাঁওলি লক্ষ্য করত।
অন্য বন্দিদের সাথে সুবর্ণর ব্যবহার দেখত। সে কারো সাথে ঝগড়া করত না, কিন্তু অন্যের ঝগড়া থামাত। ব্যারাকে নতুন কেউ এলে — ভয়ে কাঁপতে থাকা তরুণ, বা আতঙ্কে পাগল হয়ে যাওয়া মধ্যবয়স্ক — সুবর্ণ চুপচাপ তাদের পাশে গিয়ে বসত। কথা বলত না বেশি। শুধু থাকত।
জেলের লাইব্রেরিতে সে যেতে শুরু করেছিল বছর পাঁচেক আগে। প্রথমে অভিধান, তারপর ইতিহাস, তারপর সাহিত্য। গার্ডরা বলত, সুবর্ণ দা সারারাত বালবের আলোয় বই পড়ে।
একদিন শাঁওলি লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখল সে রবীন্দ্রনাথের 'গোরা' পড়ছে।
"কেমন লাগছে?"
সুবর্ণ চমকে উঠল। তারপর বলল, "জটিল। মানুষটা নিজেকে খুঁজছে। নিজেই জানে না সে কে।"
"তোমার নিজের মতো?"
কথাটা বেরিয়ে গেল শাঁওলির মুখ থেকে। বলার পরে নিজেই একটু সংকুচিত হল।
কিন্তু সুবর্ণ রাগ করল না। একটু ভাবল। তারপর বলল, "হয়তো। তবে গোরা মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে ছিল। আমি জানতাম আমি কী করছি।"
"তাহলে?"
"তাহলে হয়তো গোরার চেয়ে আমার ফেরার পথটা কঠিন।"
সেদিনের পর শাঁওলির মাথায় কথাটা থেকে গিয়েছিল।
ফেরার পথ।
সে ফিরতে চাইছে।
কয়েক মাস পরে জেলের ভেতরে একটা শিক্ষাকেন্দ্র খুলল। শাঁওলির উদ্যোগে। বাইরে থেকে একজন শিক্ষক আসতেন, বন্দিদের পড়াতেন — বাংলা, ইংরাজি, গণিত। যারা পরীক্ষা দিতে চায় তাদের জন্য নথিপত্রও করা হত।
সুবর্ণ সেই কেন্দ্রে গেল না।
কিন্তু সাতদিন পরে এল।
সেদিন শিক্ষক অসুস্থ। ক্লাস হবে না — এই কথা শুনে যখন তরুণ বন্দিরা হতাশ মুখে ফিরে যাচ্ছিল, সুবর্ণ হঠাৎ বলল, "আমি পড়াতে পারি।"
গার্ড অবাক হয়ে শাঁওলিকে ফোন করল।
শাঁওলি এল। দরজা থেকে দাঁড়িয়ে দেখল — সুবর্ণ একটা বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে, গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করেছে। হাতের লেখা যত্নশীল। বোর্ডে সে লিখছে একটা কবিতার লাইন।
"যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।"
তারপর বলল, "এই লাইনটা শুধু অন্যদের জন্য না। নিজের জন্যও।"
ক্লাসের ভেতর দশজন কঠিন মুখের মানুষ চুপ করে শুনছে।
শাঁওলি চোখ ফেরাতে পারল না।
চার
সময় এগিয়ে চলল।
শাঁওলি নিজেকে বোঝাত — এটা পেশাদার আগ্রহ। একটা কেস স্টাডি। একজন অপরাধীর সংশোধনের প্রক্রিয়া দেখা। এটাই তার কাজ।
কিন্তু নিজেকে মিথ্যা বলা যায় কতক্ষণ?
সে খেয়াল করত সুবর্ণর হাত দুটো। যে হাত একসময় ছুরি ধরত, সেই হাত এখন বই ধরে যত্নে, যেন বই ভেঙে যাবে। সে খেয়াল করত যে সে কথা বলার সময় অন্যের দিকে সোজাসুজি তাকায়, কখনো চোখ সরায় না। সে খেয়াল করত যে জেলের উঠোনে বিকেলের আলো পড়লে সে একা বসে থাকে, আকাশের দিকে তাকিয়ে — যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো জিনিসের কথা ভাবে।
একদিন সে সাহস করে জিজ্ঞেস করল, "কী ভাবো ওইভাবে?"
সুবর্ণ বলল, "মা।"
"মা কোথায়?"
"মারা গেছেন। আমার জেলে আসার তিন বছর পরে।" একটু থামল। "খবর পেয়েছিলাম চিঠিতে। ভাই লিখেছিল। তারপর আর কোনো চিঠি আসেনি।"
শাঁওলি কিছু বলতে পারল না।
"ম্যাডাম জানেন," সুবর্ণ বলল, "মায়ের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল গ্রেফতারের দিন। কাঁদছিল। আমি ভেবেছিলাম কষ্টের জন্য কাঁদছে। পরে বুঝেছি লজ্জার জন্য কাঁদছিল। ছেলের জন্য লজ্জা।"
গলা একটু ভাঙল তার।
"সেই লজ্জাটা দিয়ে যাওয়াটা আমি কোনোদিন ফেরাতে পারব না।"
সেই রাতে শাঁওলি বাড়িতে বসে বুঝতে পারল সে কোথায় পৌঁছে গেছে।
এটা পেশাদারিত্ব নয়। এটা সহানুভূতিও নয়।
এটা অন্য কিছু। অনেক বেশি বিপজ্জনক।
সে ডায়েরিতে লিখল:
"আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?"
লেখার পরে আবার কেটে দিল।
পাঁচ
বছর ঘুরল।
সুবর্ণর নাম উঠল ভালো আচরণের তালিকায়। জেল কর্তৃপক্ষ সুপারিশ করল সাজা লঘু করার। ফাইল গেল আদালতে।
শাঁওলি সেই ফাইলে সই করল।
সই করার সময় হাত কাঁপছিল। সে বুঝতে পারছিল না — ভয়ে, না অন্য কারণে।
রায় এল তিন মাস পরে। দশ বছরের সাজা কমে হল সাত বছর। আর তিন মাস পরে সুবর্ণকান্ত ঘোষ মুক্ত।
মুক্তির আগের রাতে শাঁওলি তাকে ডেকে পাঠাল।
সরকারি নিয়ম। মুক্তি পাওয়া বন্দিদের একটা প্রি-রিলিজ কাউন্সেলিং হয়। কোথায় যাবে, কী করবে, কোনো পরিচিত আছে কিনা।
কিন্তু সেদিনের কথাগুলো কাউন্সেলিং ছিল না।
শাঁওলি বলল, "কোথায় যাবে?"
"জানি না।"
"গ্রামে ফিরবে?"
"না। ভাই আর পরিচয় দিতে চায় না। গ্রামে মুখ দেখাব কীভাবে?"
"তাহলে?"
"কলকাতায় যাব। কোনো কাজ পাব। সৎভাবে বাঁচার চেষ্টা করব।"
একটু চুপ থেকে সুবর্ণ বলল, "ভয় লাগছে, ম্যাডাম। ভেতরে থাকতে ভয় লাগত না। বাইরে যেতে লাগছে।"
"কেন?"
"ভেতরে জানি কী হবে। বাইরে জানি না।" একটা ক্লান্ত হাসি। "আর ভেতরে... অন্তত কথা বলার মানুষ ছিল।"
কথাটা বলেই সুবর্ণ থামল। চোখ নামিয়ে নিল।
শাঁওলি বুঝল সে কী বলতে চাইছে।
বুকের ভেতরে একটা টান।
সে বলল, "সুবর্ণ।"
"ম্যাডাম?"
"আমি... আমি চাই তুমি ভালো থাকো।"
"জানি।"
"শুধু সেটুকু নয়।" গলাটা একটু কাঁপল। "তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। তোমাকে দেখতে... ভালো লাগে।"
নিস্তব্ধতা।
সুবর্ণ মাথা তুলে তাকাল।
শাঁওলি বলল, "আমি জানি এটা ঠিক না। আমি তোমার অফিসার। তুমি একজন বন্দি। কিন্তু কাল তুমি মুক্ত হয়ে যাচ্ছ। তারপর... তারপর আমরা শুধু দুটো মানুষ।"
সুবর্ণ অনেকক্ষণ কিছু বলল না।
তারপর ধীরে ধীরে বলল, "ম্যাডাম, আমি একজন অপরাধী ছিলাম।"
"ছিলাম।"
"আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।"
"ভবিষ্যৎ থাকে না, বানাতে হয়।"
আরেকটু নিস্তব্ধতা।
তারপর সুবর্ণ বলল, "আমি আপনার যোগ্য নই।"
শাঁওলি বলল, "যোগ্যতার সার্টিফিকেট আমি দেব, না তুমি?"
ছয়
পরদিন ভোরে সুবর্ণকান্ত ঘোষ সেই বিশাল লৌহকপাটের সামনে দাঁড়াল।
কাগজপত্র হয়ে গেছে। গেটটা খুলল।
সে বেরিয়ে এল।
রাস্তার ওপারে একটা চায়ের দোকান। রিকশা যাচ্ছে। সাইকেল। একটা গরু ধীরে পার হচ্ছে।
পৃথিবী থেমে থাকেনি।
সে আকাশের দিকে তাকাল। নীল। ঠিক আগের মতোই নীল।
পিছনে পায়ের আওয়াজ।
ঘুরে দেখল — শাঁওলি।
অফিসার ইউনিফর্মে নয়। সাদা শাড়িতে। একটু অস্বস্তিতে। যেন সে নিজেও জানে না কেন এসেছে।
"কফি খাবে?" সে বলল।
সুবর্ণ হাসল। সেই হাসিতে সাত বছর ছিল, সাত বছরের ক্লান্তি ছিল, এবং তার পাশাপাশি — অনেক দিন পরে — একটুকরো আলো।
"খাব।"
সাত
এরপর একটা বছর।
সহজ ছিল না। মোটেই না।
প্রথমে সুবর্ণ কলকাতায় একটা ছাপাখানায় কাজ পেল। ছোট কাজ, কম মাইনে। কিন্তু সৎ। সে ভাড়া ঘর নিল। একা থাকত। রান্না শিখল।
শাঁওলির সাথে যোগাযোগ রইল — প্রথমে সাবধানে, দূরত্ব রেখে। ফোনে কথা। মাঝে মাঝে দেখা।
কিন্তু দুজনেই জানত।
শাঁওলির মা জানলে ঝড় উঠল। "একজন জেলফেরত মানুষ? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?"
শাঁওলি শান্তভাবে বলল, "মা, মানুষটাকে একবার দেখো।"
সুবর্ণর ভাই জানল। ফোনে বলল, "তোর লজ্জা নেই? একজন অফিসারকে জড়াচ্ছিস?"
সুবর্ণ বলল, "সে আমাকে জড়িয়েছে।"
সহকর্মীরা কানাঘুষো করল। শাঁওলি চুপ থাকল।
একদিন তার সুপারিন্টেনডেন্ট ডেকে বললেন, "এই সম্পর্কটা তোমার কেরিয়ারের পক্ষে ভালো না।"
শাঁওলি বলল, "স্যার, ভালো কেরিয়ারের জন্য আমি কি ভালো মানুষকে ছেড়ে দেব?"
একটা সন্ধ্যায় ময়দানে বসেছিল দুজনে। শীতের শুরু। অন্ধকার নামছে।
সুবর্ণ বলল, "তুমি কি কখনো ভয় পাও?"
"কীসে?"
"আমাকে নিয়ে। আমার অতীত নিয়ে।"
শাঁওলি একটু ভাবল।
"অতীত নিয়ে ভয় পাই না। অতীত তো সত্যি। সত্যিকে ভয় পেলে চলে না।"
"তাহলে কী নিয়ে ভয়?"
"ভয় পাই যদি তুমি নিজেকে ছোট মনে করো। যদি মনে করো তুমি এটার যোগ্য নও।"
সুবর্ণ চুপ করে থাকল।
শাঁওলি বলল, "রত্নাকর ডাকাত বাল্মীকি হয়েছিল। কিন্তু বাল্মীকির গল্পে কেউ সীতার কথা বলে না।"
"মানে?"
"মানে বাল্মীকির জীবনে যে মানুষটা এসেছিল, যে তাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল সে বদলাতে পারে — সে কে ছিল? সেও কেউ ছিল। হয়তো তার গল্পটাও ছিল।"
সুবর্ণ ধীরে ধীরে হাসল।
"তুমি কি সেটা হতে চাও?"
"আমি তোমার সাথে থাকতে চাই। বাকি গল্পটা একসাথে লিখতে চাই।"
আট
বিয়েটা হল খুব সাদামাটাভাবে।
রেজিস্ট্রি অফিসে। দুটো সাক্ষী — শাঁওলির এক বান্ধবী, আর ছাপাখানার সুবর্ণর এক সহকর্মী। মা এলেন না। ভাই এল না।
কিন্তু বেরিয়ে আসার সময় রোদ ছিল।
সুবর্ণ কাগজটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল।
"কী হল?" শাঁওলি জিজ্ঞেস করল।
"ভাবছি।"
"কী?"
"এই কাগজটায় আমার নাম লেখা। সুবর্ণকান্ত ঘোষ। আর তোমার নাম। একসাথে।" গলা একটু ভাঙল। "এত বছর আমার নাম ছিল ফাইলে, চার্জশিটে, ব্যারাকের তালিকায়। এই প্রথম কোনো ভালো কাগজে।"
শাঁওলি তার হাত ধরল।
সুবর্ণ বলল, "তুমি কি ভয় পাচ্ছ ?"
"না।"
"কেন?"
"কারণ তুমিও পাচ্ছো না।"
নয়
তাদের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট হল দক্ষিণ কলকাতায়।
শাঁওলি সকালে জেলে যায়। বিকেলে ফেরে। সুবর্ণ ততদিনে ছাপাখানা ছেড়ে একটা এনজিওতে কাজ পেয়েছিল — কারামুক্ত মানুষদের পুনর্বাসনে সাহায্য করে তারা। সুবর্ণর অভিজ্ঞতা সেখানে সোনার চেয়ে দামি।
একদিন শাঁওলি বাড়ি ফিরে দেখল রান্নাঘরে রান্না হচ্ছে। পাতলা ডাল, আলু ভাজা। সুবর্ণ হাতা নাড়ছে।
"কী রান্না?"
"মায়ের রেসিপি।" একটু থামল। "মনে আছে সব। ভুলিনি।"
শাঁওলি বসে পড়ল খাবারের টেবিলে।
"এনজিওতে আজ একটা ছেলে এসেছিল," সুবর্ণ বলল, "মাত্র আঠারো বছর বয়সে জেলে গিয়েছিল। পাঁচ বছর পরে বেরিয়ে বুঝতে পারছে না কোথায় যাবে। বাড়ি নেই, কাজ নেই।"
"তুমি কী বললে তাকে?"
"বললাম যে শুরুটা সহজ না। কিন্তু এক পা এক পা করে এগোতে হয়। প্রতিটা ভালো কাজ আগের একটা খারাপকে একটুখানি ঢেকে দেয়। সব ঢাকা পড়বে না কোনোদিন। কিন্তু নতুন গল্পটা শুরু হয়।"
শাঁওলি তাকাল।
"তুমি নিজেকে দেখছ ওই ছেলেটার মধ্যে?"
"সবসময়।"
সে থালায় ভাত দিল।
"আর আমাকে দেখছ?"
সুবর্ণ হাসল। "সেই ম্যাডামকে দেখছি যে আমাকে মাথা তুলে কথা বলতে বলেছিল।"
দশ
বছর ঘুরল।
শাঁওলির মা একদিন এলেন। বিনা নোটিশে।
দরজা খুলল সুবর্ণ।
মহিলা তাকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখলেন। সুবর্ণ একটু পিছিয়ে গেল।
"ভেতরে আসতে বলবে না?" মহিলা বললেন।
"আসুন।"
তিনি ঢুকলেন। ঘরটা দেখলেন। পরিষ্কার। সাজানো। দেয়ালে একটা ছোট্ট তাক, তাতে কয়েকটা বই।
"শাঁওলি নেই?"
"অফিসে। সন্ধ্যায় আসবে।"
মহিলা সোফায় বসলেন। চুপ।
সুবর্ণ জিজ্ঞেস করল, "চা করব?"
"করো।"
রান্নাঘরে চা বানাতে বানাতে সুবর্ণর হাত কাঁপছিল। এই মহিলাকে সে ভয় পায় না। কিন্তু তার জন্য দুঃখ লাগে। মেয়ে তার কাছ থেকে কতটা দূরে সরে গেছে।
চা দিয়ে সামনে বসল।
মহিলা চায়ের কাপে চোখ রেখে বললেন, "তুমি কি আমার মেয়েকে সুখী রাখতে পারবে?"
"চেষ্টা করব। প্রতিদিন।"
"তোমার অতীত?"
"সেটা থাকবেই। পাল্টানো যাবে না। কিন্তু সেই অতীতের কারণে বর্তমানকে আমি নষ্ট করতে দেব না।"
মহিলা চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন, "শাঁওলির বাবা মারা গেছে যখন, সে দশ বছরের। তারপর থেকে সে একা লড়াই করেছে সবসময়। ভালোবাসার জন্য কখনো কারো কাছে হাত পাতেনি।"
চোখটা একটু ভিজল তাঁর।
"এই প্রথম সে হাত পাতল।"
সুবর্ণ কিছু বলল না।
মহিলা বললেন, "সেই হাতটা ধরে রেখো।"
সন্ধ্যায় শাঁওলি বাড়ি ঢুকে দেখল মা আর সুবর্ণ একসাথে বসে টিভিতে সিরিয়াল দেখছে। মা কিছু একটা বলছেন, সুবর্ণ মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে।
শাঁওলি দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল।
বুকের ভেতরে কী একটা নরম হয়ে গেল।
এক বছর পরে।
বর্ধমান সেন্ট্রাল জেলে সেদিন একটা অনুষ্ঠান।
সংশোধনাগারের নতুন একটা শিক্ষাকার্যক্রম চালু হচ্ছে — যেখানে জেলমুক্ত মানুষেরা এসে বর্তমান বন্দিদের সাথে কথা বলবে। তাদের নিজের গল্প বলবে।
প্রথম বক্তা সুবর্ণকান্ত ঘোষ।
সে সেই লৌহকপাট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল — এবার স্বেচ্ছায়।
ব্যারাকের উঠোনে পাঁচশো বন্দি। বিভিন্ন বয়স। বিভিন্ন মামলা। বিভিন্ন চোখের ভাষা।
সুবর্ণ মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল।
"আমি এখানে এসেছিলাম বন্দি হয়ে। আজ এসেছি মানুষ হয়ে।"
ভিড়ের মধ্যে কেউ একটু নড়ল।
"জেলের ভেতরে থেকে মনে হয় বাইরের পৃথিবী অনেক দূরে। হয়তো হাতের নাগালের বাইরে। কিন্তু আমি বলছি — বাইরের পৃথিবীটা এখানেও আছে। তোমার ভেতরে আছে। সেটাকে বাঁচিয়ে রাখো।"
সে একটু থামল।
"আমি ডাকাত ছিলাম। মানুষকে ভয় দেখিয়েছি। কষ্ট দিয়েছি। সেটা মুছে যাবে না। কিন্তু আমি এখন ছাপাখানায় শ্রমিকদের সাথে কাজ করি। জেলফেরত মানুষদের পুনর্বাসনে সাহায্য করি। এবং..." একটু থামল, "আমার একজন জীবনসাথী আছে, যে আমার মধ্যে আমার চেয়ে বেশি বিশ্বাস রেখেছিল।"
পিছনের সারিতে শাঁওলি দাঁড়িয়ে ছিল। ইউনিফর্মে। কিন্তু আজ তার চোখে শুধু অফিসার নয়, একজন মানুষ।
সুবর্ণ সামনের সারির একটি তরুণের দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে সেই পুরনো নিস্পৃহতা। সুবর্ণ চেনে সেই চোখ। আয়নায় দেখেছিল।
"তুমি কতটা ভেঙে পড়েছ, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল এরপরও উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছাটুকু আছে কিনা। সেটুকু থাকলেই হয়। বাকিটা আসে।"
ছেলেটার চোখ একটু পাল্টাল।
একটুকরো আলো।
সেদিন বিকেলে ফেরার পথে সুবর্ণ আর শাঁওলি সেই লৌহকপাটের সামনে দাঁড়াল।
সুবর্ণ পিছন ফিরে তাকাল।
"কী ভাবছ?" শাঁওলি জিজ্ঞেস করল।
"ভাবছি সাত বছর আগে এই দরজা দিয়ে ঢুকেছিলাম। মনে হয়েছিল জীবন শেষ।"
"আর এখন?"
সুবর্ণ তার হাত ধরল।
"এখন মনে হচ্ছে শুরু।"
শাঁওলি একটু হাসল।
লৌহকপাটের ওপারে সূর্য ডুবছিল। আকাশে কমলা আভা। সেই আলোয় দুটো মানুষ — একজন যে ভেঙে পড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, একজন যে হাত ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছে — হেঁটে চলল।
লৌহকপাট পিছনে রইল।
সামনে রইল পথ।
লৌহকপাট বন্ধ করে না সবসময়। কখনো কখনো সেই ভারী দরজার ওপারেই লুকিয়ে থাকে নতুন জীবনের চাবিকাঠি।

পুনর্জন্ম: পাঁচটি বিস্ময়কর সত্য

 




বিজ্ঞানের সীমানায় পুনর্জন্ম: পাঁচটি বিস্ময়কর সত্য যা আমাদের অস্তিত্বকে নতুন করে ভাবতে শেখায়

একজন দুই বছর বয়সী শিশু, যে কখনো যুদ্ধবিমানের ককপিট চোখে দেখেনি, সে কীভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ক্যাটালিনা বা করসেয়ার বিমানের যান্ত্রিক খুঁটিনাটি নির্ভুলভাবে বর্ণনা করতে পারে? এটি কি কেবল প্রখর কল্পনাশক্তি, নাকি আমাদের বর্তমান চেতনার গভীরে প্রোথিত অন্য কোনো জীবনের অবশিষ্টাংশ? একজন প্যারাসাইকোলজি গবেষক হিসেবে আমি দেখেছি, আধুনিক বিজ্ঞান যখনই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে চেয়েছে, তখনই সামনে এসেছে ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির 'ডিভিশন অব পারসেপচুয়াল স্টাডিজ' (UVA DOPS)-এর কয়েক দশকের গবেষণা। ডক্টর ইয়ান স্টিভেনসন এবং পরবর্তীতে ডক্টর জিম বি. টাকার ২৫০০-এরও বেশি শিশুর ঘটনা বিশ্লেষণ করেছেন, যা পুনর্জন্মের ধারণাকে নিছক বিশ্বাসের গণ্ডি থেকে বের করে বিজ্ঞানের এক অমীমাংসিত কিন্তু অত্যন্ত 'কম্পেলিং' বা জোরালো রহস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আজ আমরা এই গবেষণার এমন পাঁচটি বিস্ময়কর সত্য আলোচনা করব, যা আপনার অস্তিত্বের ধারণাটিকেই বদলে দিতে পারে।

১. জন্মচিহ্ন যখন অতীতের ক্ষতচিহ্ন (Experimental Birthmarks)

শারীরিক স্তরে স্মৃতির স্থানান্তর কি সম্ভব? UVA-র গবেষক জিম টাকার এবং ইয়ান স্টিভেনসন থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারে 'এক্সপেরিমেন্টাল বার্থমার্কস' বা পরীক্ষামূলক জন্মচিহ্নের ওপর দীর্ঘ গবেষণা চালিয়েছেন। এই দেশগুলোতে একটি প্রচলিত প্রথা হলো, কেউ মারা গেলে তার পুনর্জন্মের প্রমাণ রাখার জন্য লাশের শরীরে কালির দাগ বা ছাই মেখে দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পরবর্তী সময়ে ওই পরিবারেই জন্ম নেওয়া শিশুদের ঠিক সেই নির্দিষ্ট স্থানেই জন্মচিহ্ন ফুটে উঠেছে।

একটি গবেষণাপত্রে ১৮টি এমন ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬টি ক্ষেত্রে শিশুরা তাদের পূর্বজীবনের সঠিক তথ্য দিতে সক্ষম হয়েছিল। গবেষকরা দেখেছেন, এই জন্মচিহ্নগুলো অনেক সময় 'হাইপারপিগমেন্টেড নেভাস' (Hyperpigmented Nevus) হিসেবে দেখা দেয়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে জন্মগতভাবে খুব কমই ঘটে। এটি কি কেবল কাকতালীয়, নাকি ডক্টর টাকারের ভাষায় শারীরিক কোনো সংযোগ?

ডক্টর জিম টাকার তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন: "অস্বাভাবিক আকৃতি বা আকারের এই জন্মচিহ্নগুলো অনেক সময় মৃত ব্যক্তির শরীরে থাকা সেই মারাত্মক জখম বা ক্ষতের অবস্থানের সাথে হুবহু মিলে যায়, যা শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।"

২. জেমস লাইনিংগার: দুই বছরের শিশুর ঐতিহাসিক জ্ঞান

জেমস লাইনিংগারের ঘটনাটি পুনর্জন্মের গবেষণায় এক অনন্য মাইলফলক। মাত্র দুই বছর বয়স থেকে জেমস বিমান দুর্ঘটনার তীব্র দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করে। সে চিৎকার করত— "প্লেন ক্রাশ! আগুনে পুড়ছে! ছোট মানুষটি বের হতে পারছে না!" আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে তার বিমান সম্পর্কে এমন সব তথ্য দিয়েছিল যা ওই বয়সের শিশুর পক্ষে জানা অসম্ভব।

জেমসের দেওয়া তথ্যের একটি সংক্ষিপ্ত তুলনা নিচে দেওয়া হলো:

  • জাহাজের নাম: জেমস জানিয়েছিল তার জাহাজটি ছিল 'Natoma' (নাতোমা)। পরে তথ্য মিলেছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে 'USS Natoma Bay' নামে একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ছিল।
  • বন্ধুর পরিচয়: সে 'Jack Larsen' (জ্যাক লারসেন) নামে একজনের কথা বলেছিল। গবেষণায় দেখা যায়, জ্যাক লারসেন নামে এক পাইলট আসলেই সেই জাহাজে জেমস হাস্টনের সাথে ছিলেন।
  • বিমানের খুঁটিনাটি: জেমস দাবি করত সে 'Corsair' (করসেয়ার) বিমান চালাত। সে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিল যে, "করসেয়ার বিমান নামার সময় টায়ার পাংচার হয়ে যেত।" ঐতিহাসিক রেকর্ড নিশ্চিত করে যে, করসেয়ার বিমানগুলো অবতরণের সময় খুব বেশি লাফালাফি করত, যা প্রায়ই টায়ারের ক্ষতি করত।
  • ভৌগোলিক অবস্থান: মাউন্ট সুরিবাচি (Mt. Suribachi)-র ছবি দেখে সে সেটিকে তার বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
  • স্বাক্ষরের রহস্য: জেমস তার আঁকা ছবিতে 'James 3' স্বাক্ষর করত। সে দাবি করত সে হলো "তৃতীয় জেমস"। মজার বিষয় হলো, পাইলট জেমস হাস্টন জুনিয়র ছিলেন তার বাবার দ্বিতীয় জেমস।

৩. হারানো প্রতিভার ফিরে আসা: রায়ান হ্যামনস এবং মার্টি মার্টেন

ওকলাহোমার শিশু রায়ান হ্যামনসের দাবি ছিল সে একজন হলিউড এজেন্ট ছিল। রায়ানের মা একটি বই থেকে পুরনো চলচ্চিত্রের ছবি দেখানোর সময় রায়ান 'মার্টি মার্টেন' (Marty Martyn) নামে এক হলিউড এক্সট্রা ও ট্যালেন্ট এজেন্টকে নিজের পুরনো সত্তা হিসেবে শনাক্ত করে। রায়ানের এই শনাক্তকরণ ছিল নিখুঁত এবং বিস্ময়কর।

রায়ানের আচরণে মার্টি মার্টেন-এর জীবনধারা ফুটে উঠেছিল:

  • সে সানগ্লাস সংগ্রহ করতে পছন্দ করত এবং চমৎকার ট্যাপ-ড্যান্স করত।
  • সে চপস্টিক ব্যবহার করে স্বাচ্ছন্দ্যে খাবার খেত এবং পোশাকে 'এজেন্ট' সুলভ আভিজাত্য পছন্দ করত।

রায়ানের মা যখন তার এই দাবির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি, তখন রায়ান বলেছিল: "মা, আমি ৫ বছরের শিশু নই; আমার বয়স আসলে ১০৫ এর কাছাকাছি।"

গবেষণায় দেখা গেছে, মার্টি মার্টেন ১৯০৩ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি যদি জীবিত থাকতেন, তবে রায়ানের ওই উক্তির সময় তার বয়স হতো ১০৬ বছর। রায়ানের এই গাণিতিক সঠিকতা গবেষকদের অবাক করেছে। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে মার্টি মার্টেন আসলেই ৬১ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন (যদিও নথিতে ৫৯ লেখা ছিল)।

৪. 'ইন্টারমিশন': দুই জীবনের মাঝখানের স্মৃতি

অনেক শিশু কেবল মৃত্যুর স্মৃতিই নয়, বরং এক জন্ম থেকে অন্য জন্মের মাঝখানের সময় বা 'ইন্টারমিশন' পিরিয়ডের বর্ণনা দেয়। এই বর্ণনায় তারা জ্যোতির্ময় আলো বা নিজেদের হবু বাবা-মাকে বেছে নেওয়ার কথা বলে। রিলায়েন (Rylann) নামে এক শিশুর ঘটনা এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

রিলায়েন শৈশবে প্রায়ই অভিযোগ করত যে তার কাপড়ে পিঠ চুলকাচ্ছে বা জ্বালাপোড়া করছে। সে বলত, "আমার চামড়া পুড়ে যাচ্ছে।" এটি নিছক কল্পনা ছিল না। রিলায়েন দাবি করেছিল সে 'জেনিফার' (Jennifer) নামে একজনকে মনে করতে পারে যে এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। পরবর্তীতে গবেষণায় ১৯৮২ সালের 'প্যান এ্যাম ৭৫৯' (Pan Am 759) বিমান দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়, যেখানে ১১ বছর বয়সী জেনিফার শুল্টজ তার বাড়ির উঠানে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মারা যান। জেনিফারের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নিশ্চিত করে যে তার শরীর মারাত্মকভাবে পুড়ে গিয়েছিল। রিলায়েনের পিঠের সেই অস্বস্তি আসলে জেনিফারের শেষ মুহূর্তের শারীরিক বেদনারই এক অবশিষ্টাংশ বা 'বিহেভিয়ারাল ক্যারিওভার'।

৫. শানতি দেবী: স্বীকৃতির অকাট্য প্রমাণ

ভারতের শানতি দেবীর ঘটনাটি পুনর্জন্ম গবেষণার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। ১৯২৬ সালে দিল্লিতে জন্ম নেওয়া শানতি দেবী শৈশব থেকেই দাবি করতেন তার আসল বাড়ি মথুরায় এবং তার স্বামী হলেন 'কেদারনাথ চৌবে'।

প্যারাসাইকোলজিস্টদের মতে, এই কেসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল লুই ভাষাগত প্রমাণ। শানতি দেবী দিল্লিতে থাকলেও কথা বলার সময় অনায়াসেই মথুরার স্থানীয় উপভাষা (Mathura dialect) ব্যবহার করতেন, যা তার পক্ষে জানা বা শেখা অসম্ভব ছিল। মহাত্মা গান্ধীর নির্দেশে গঠিত একটি ১৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি তাকে মথুরায় নিয়ে যায়। সেখানে তিনি কেবল তার পূর্বজন্মের স্বামী ও পরিবারকে চিনতেই পারেননি, বরং তার পুরনো বাড়ির গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখা টাকা এবং বিশেষ কিছু কক্ষের সঠিক হদিস দিয়েছিলেন। গান্ধীর কমিশন তদন্ত শেষে রায় দেয় যে, শানতি দেবী আসলেই লুগদি দেবীর পুনর্জন্ম।

উপসংহার: জীবনের ওপারে আরও কিছু

একজন গবেষক হিসেবে আমি মনে করি, এই ঘটনাগুলোকে কেবল অলৌকিক গালগল্প বলে উড়িয়ে দেওয়া বিজ্ঞানসম্মত নয়। ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির ডাটাবেসে থাকা হাজার হাজার কেস প্রমাণ করে যে, প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশুদের শরীরে এমন জন্মচিহ্ন বা ত্রুটি থাকে যা পূর্ববর্তী ব্যক্তির মৃত্যুর কারণের সাথে মিলে যায়।

যদিও বর্তমান মূলধারার বিজ্ঞান এখনো এর পেছনে কোনো বস্তুগত ব্যাখ্যা বা মেকানিজম খুঁজে পায়নি, তবুও এই 'যাচাইকৃত ঐতিহাসিক জ্ঞান' এবং 'শারীরিক চিহ্নগুলো' আমাদের অস্তিত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার দাবি রাখে। শেষে আপনাদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে শেষ করতে চাই:

"যদি আমাদের স্মৃতি এবং ব্যক্তিত্ব মৃত্যুর পরেও টিকে থাকে, তবে আমাদের বর্তমান জীবনের উদ্দেশ্য কি আমূল বদলে যায় না?"

নিয়তি। অলৌকিক গল্প





 নিয়তি

ব্যারাকপুরের ওই পুরনো রাস্তাটার একটা নিজস্ব চরিত্র আছে। দুপাশে আকাশছোঁয়া প্রাচীন শিরীষ আর রাধাচূড়ার গাছগুলো ব্রিটিশ আমল থেকে দাঁড়িয়ে। অন্য দিন হলে এই চিলতে ছায়াটার নিচে দাঁড়ালে শান্তিবোধ হতো, কিন্তু আজ দিনটা আলাদা। বাতাস যেন ভারী হয়ে জমে আছে। একটা পাতাও নড়ছে না। আকাশের মুখ গোমড়া, অথচ বৃষ্টির কোনো লক্ষণ নেই। শুধু এক অসহ্য, গুমোট আবহে ছটফট করছে চরাচর। পর্ণা তার বন্ধুদের বিদায় জানাতে মেইন রোডের মোড়টায় এসে দাঁড়িয়েছিল। অঙ্কিত, সায়ন্তনী আর ঋত্বিক—কলেজের প্রজেক্ট শেষ করে আজ বেশ আনন্দেই ছিল ওরা। "পরের সপ্তাহে কিন্তু তোদের বাড়িতেই আড্ডা হবে," হাসতে হাসতে বলছিল পর্ণা। ঠিক তখনই কোনো আওয়াজ নেই, কোনো পূর্বাভাস নেই, যেন এক অদৃশ্য কুঠারের আঘাতে রাস্তার ধারের প্রাচীন শিরীষ গাছটার একটা মস্ত বড়, নিরেট ডাল সটান নেমে এলো ঠিক পর্ণার মাথায়। যেন কোনো এক অদৃশ্য শিকারি লক্ষ্যভেদের নিখুঁত নিশানায় ডালটি ছুড়ে দিল। মুহূর্তের জন্য থমকে গেল চারপাশ। বন্ধুদের সম্বিৎ ফিরতেই তারা চিৎকার করে উঠল। চারপাশের মানুষজন ছুটে এলো। পর্ণা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। অদ্ভুত বিষয়, অত বড় ডালটা পড়ার পর গাছের বাকি অংশটা বা আশেপাশের অন্য কোনো গাছের পাতা একটুও কাঁপল না। যেন প্রকৃতি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শুধু একটা কাজই করতে এসেছিল। ঋত্বিক আর অঙ্কিত ধরাধরি করে একটা ট্যাক্সি ডাকল। সায়ন্তনী পর্ণার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। পর্ণার চোখ দুটো খোলা, কপাল বেয়ে রক্ত নামছে, কিন্তু তার মুখে কোনো যন্ত্রণার রেখা নেই। বরং এক অদ্ভুত নিরাসক্ত দৃষ্টি। গাড়িতে যাওয়ার সময় সায়ন্তনী কাঁদছিল। পর্ণা ফিসফিস করে বলল, "কাঁদছিস কেন রে? আমি তো ঠিক আছি।" অঙ্কিত সামনে থেকে বলল, "তুই একদম কথা বলিস না পর্ণা, আমরা হাসপাতালে পৌঁছে গেছি প্রায়।" পর্ণা একটু হাসল। বলল, "জানিস, ডালটা যখন পড়ছিল, আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু ওটা গাছের ডাল ছিল না রে।" "মানে? কী বলছিস?" সায়ন্তনী ওর হাতটা চেপে ধরল। "ডালটা পড়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে, একটা কুচকুচে কালো মস্ত বড় ছায়া ওপর থেকে নেমে এল। ঠিক যেন একটা মানুষের হাত। আমাকে চুল ধরে টেনে নিল । ওটা ডাল ছিল না... ওটা একটা হাত..." পর্ণার গলা জড়িয়ে আসছিল। কিন্তু তার কথা বলার মধ্যে কোনো অসংলগ্নতা বা প্রলাপের ছোঁয়া ছিল না। মনে হচ্ছিল সে যা দেখেছে, পরম শান্তিতে সেটাই বর্ণনা করছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর ঠিক দু-মিনিট আগে পর্ণা চোখ বোজে। ডাক্তাররা সব চেষ্টা করেও তাকে আর বাঁচাতে পারেননি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ আর ইন্টারনাল ইনজুরির কারণে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত, যদি না ঘটনার পরদিন এক অদ্ভুত সত্য সামনে আসত। পর্ণার মৃত্যুর ধাক্কা সামলে উঠতে না পেরে, অঙ্কিত আর ঋত্বিক পরদিন বিকেলে আবার সেই দুর্ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। মনটা বড্ড ভারী ছিল ওদের। কিন্তু সেখানে গিয়ে ওরা যা দেখল, তাতে ওদের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। যে বিরাট ডালটা পর্ণার ওপর পড়েছিল, সেটাকে পুরসভার কর্মীরা রাস্তার পাশে সরিয়ে রেখেছে। কিন্তু গাছটার দিকে তাকাতেই ঋত্বিকের চোখ আটকে গেল। "অঙ্কিত, একটু ভালো করে দেখ তো..." ঋত্বিকের গলা কাঁপছিল। পুরনো শিরীষ গাছটার যে অংশ থেকে ডালটা ভেঙে পড়েছে, সেখানে কোনো কাঁচা বা শুকনো ভাঙার দাগ নেই। সাধারণত ডাল ভাঙলে সেখানে কাঠ বা ছালের একটা এবড়োখেবড়ো অংশ চেরা অবস্থায় থাকে। কিন্তু এই গাছটির ক্ষেত্রে, ডালটি যেখানে মূল কাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিল, সেখানে কাঠ মসৃণ, কালচে এবং এমনভাবে কাটা—যেন কোনো অতিপ্রাকৃতিক করাত দিয়ে নিখুঁত মাপে কেটে আলাদা করা হয়েছে বহু বছর আগে! অথচ ডালটি কাল পর্যন্ত গাছের অংশ ছিল, সবুজ পাতা ছিল তাতে। সবচেয়ে ভয়ানক কাণ্ড ঘটল ঠিক তার পরে। স্থানীয় এক প্রবীণ দোকানদার ওদের দিকে এগিয়ে এলেন। তিনি চশমাটা মুছে বললেন, "তোমরাই কাল ওই মেয়েটার সাথে ছিলে তো? বড় দুঃখের ঘটনা। কিন্তু একটা কথা মাথায় ঢুকছে না বাবা..." "কী দাদু?" অঙ্কিত জিজ্ঞেস করল। বৃদ্ধ গাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন, "এই গাছটার ওই ডালটা তো আজ থেকে তিরিশ বছর আগে, ১৯৯৬ সালের এক কালবৈশাখীতে ভেঙে পড়ে গিয়েছিল। আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম। তারপর থেকে ওই জায়গাটা ওরম ফাঁকাই ছিল। কাল হঠাৎ ওপর থেকে ওই ডালটা কোথা থেকে এলো, আর পড়ল—সেটা কিছুতেই বুঝছি না!" অঙ্কিত আর ঋত্বিক একে অপরের দিকে তাকাল। পর্ণার শেষ কথাগুলো ওদের কানে বাজতে লাগল: "ওটা গাছের ডাল ছিল না রে... একটা কুচকুচে কালো ছায়া ওপর থেকে নেমে এল..." তীব্র দাবদাহের মধ্যেও ব্যারাকপুরের সেই তপ্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুই বন্ধুর গা শিউরে উঠল। বিজ্ঞানের কোনো সূত্র, কোনো ব্যাখ্যা বা প্রকৃতির কোনো নিয়ম সেদিন সেই শূন্য থেকে নেমে আসা ডালটার রহস্যের কিনারা করতে পারেনি।

পুনর্মিলন । অলৌকিক গল্প

 

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। মকবুল যখন সদর দরজা খুলে বাইরে পা বাড়ালেন, তখন চারপাশ নিঝুম। তার পিঠে একটা ধূসর চাদর জড়ানো, চোখ জুড়ে শূন্যতা। গত দুটো বছর যেন এই বাড়িটা এক জীবন্ত নরক হয়ে উঠেছে তার কাছে। প্রথমে একমাত্র ছেলে রনির পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু, আর সেই শোক সহ্য করতে না পেরে ঠিক ছ-মাসের মাথায় স্ত্রী রাবেয়ার চলে যাওয়া— পরপর দুটো আঘাত মকবুলকে আক্ষরিক অর্থেই পাথর করে দিয়েছিল। সংসারের বাকি মানুষেরা তার এই চুপচাপ বেরিয়ে যাওয়া দেখেও কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি। তারা ভেবেছিল, হয়তো মনের ব্যাকুলতায় একটু নদীর পাড় থেকে ঘুরে আসবেন। কিন্তু বেলা গড়িয়ে দুপুর বারোটা ছুঁইছুঁই হলেও যখন মকবুল ফিরলেন না, তখন চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু হলো। বেশিদূর যেতে হয়নি। গ্রামের শেষ প্রান্তে, ঝাউগাছের ছায়ায় ঘেরা পুরোনো গোরস্থানটার ভেতরেই পাওয়া গেল তাকে। কিন্তু সেখানে যে দৃশ্য অপেক্ষা করছিল, তা দেখে উপস্থিত সবার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। মকবুল শুয়ে আছেন রনি আর রাবেয়ার পাশাপাশি দুটো কবরের মাঝখানের খালি জায়গাটুকুতে। তার বাঁ হাতটা প্রসারিত হয়ে আছে ছেলের সমাধির ওপর, আর ডান হাতটা পরম মমতায় ছুঁয়ে আছে স্ত্রীর কবরের মাটি। তার মুখে কোনো যন্ত্রণার ছাপ নেই, বরং এক অদ্ভুত, অলৌকিক প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে ঠোঁটের কোণে। যেন বহু বছর পর এক তৃপ্তির ঘুম ঘুমিয়েছেন তিনি। কাছে গিয়ে যখন তার দেহ স্পর্শ করা হলো, দেখা গেল শরীর একদম হিম। শুধু একটা জিনিস সবার নজর কাড়ল— তার ডান পায়ের গোড়ালির ঠিক ওপরে একটা গভীর, কালচে ক্ষত চিহ্ন। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে পরে জানা গেল, কোনো এক তীব্র বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়ে তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ বা ডাক্তার— কেউই মেলাতে পারলেন না, এই অঞ্চলের চেনা কোনো সাপের বা পোকার বিষ এতটা মারাত্মক হতে পারে না যা আধঘণ্টার মধ্যে একজন মানুষকে নিঃশব্দে মেরে ফেলতে পারে। গ্রামের সাধারণ মানুষ একে স্রেফ একটা দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা বলে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু আসল সত্যটা বোধহয় লুকিয়ে ছিল অন্য কোথাও, যা কেবল মকবুল নিজেই অনুভব করেছিলেন। সেই রাতে, মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে, মকবুল একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে রনি আর রাবেয়া দাঁড়িয়ে আছে। তাদের শরীর থেকে এক অলৌকিক, মৃদু আলো বেরোচ্ছে। রাবেয়া মকবুলের দিকে হাত বাড়িয়ে চেনা গলায় ডাকল, "অনেক তো একা থাকলে, আর কত কষ্ট পাবে? এবার আমাদের কাছে চলে এসো।" মকবুল কেঁদে উঠে বলেছিলেন, "আমি কীভাবে আসব? আমার যে এখনো সময় হয়নি।" তখন রনি তার ছোট্ট হাত দিয়ে মাটির দিকে ইশারা করে বলেছিল, "তুমি শুধু গোরস্থানে চলে এসো বাবা। পথ দেখানোর জন্য আমরা আমাদের দূতকে পাঠাব।" ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও মকবুলের কানে সেই ডাক বাজছিল। এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন। গোরস্থানের গেট দিয়ে যখন তিনি ভেতরে ঢুকলেন, তখন চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। ঠিক তখনই তিনি দেখতে পেলেন, রনি আর রাবেয়ার কবরের মাঝখান থেকে যেন একটা অদ্ভুত, নীলাভ আলো হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকছে। তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে গেলেন। কবরের পাশে গিয়ে যখন তিনি পরম শান্তিতে শুয়ে পড়লেন, ঠিক তখনই তার ডান পায়ের গোড়ালিতে তীব্র একটা দংশন অনুভব করলেন। অদ্ভুত বিষয় হলো, সেই কামড়ে কোনো জ্বালা ছিল না, কোনো যন্ত্রণা ছিল না। বরং একটা শীতল অনুভূতি তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। কুয়াশার মধ্য থেকে মকবুল স্পষ্ট দেখতে পেলেন, কবরের মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে এক , ডানাওয়ালা সোনালী রঙের এক কাঁকড়া বিছে। তার চোখ দুটো অবিকল মানুষের মতো উজ্জ্বল। কামড় দেওয়ার পর মুহূর্তেই পোকাটি মকবুলের দিকে চেয়ে যেন মাথা নোয়ালো, তারপর আবার মিলিয়ে গেল কবরের গভীরে। মকবুল বুঝলেন, ওটি কোনো সাধারণ বিষাক্ত পোকা ছিল না। ওটি ছিল পরলোক থেকে আসা এক অলৌকিক চাবিকাঠি, যা এই পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ-কষ্টের বন্ধন থেকে তাকে মুক্ত করতে এসেছিল। বিষের নীল স্রোত যখন তার হৃদপিণ্ডে পৌঁছাল, মকবুল তখন চোখ বুজে হাসলেন। বাঁ হাতটা ছেলের কবরে আর ডান হাতটা স্ত্রীর কবরে রেখে তিনি ফিসফিস করে বললেন, "আমি এসে গেছি..." পরপর তিনটে মৃত্যুতে গ্রামবাসী হয়তো হতবাক হয়ে কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি। কিন্তু মকবুলের আত্মা সেদিন তার হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সাথে মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। গোরস্থানের সেই নীরবতা এখনো যেন ফিসফিস করে বলে— কিছু মৃত্যু জীবনের শেষ নয়, বরং এক অলৌকিক পুনর্মিলন।



মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

হুগলির গুপ্তিপাড়া রথযাত্রা ও ‘ভাণ্ডার লুট’-এর রোমাঞ্চকর ইতিহাস

 


পুরীর পরেই যার স্থান:

হুগলির গুপ্তিপাড়া রথযাত্রা ও ‘ভাণ্ডার লুট’-এর রোমাঞ্চকর ইতিহাস

বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য পীঠস্থান হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়া। ওড়িশার পুরীর রথযাত্রার কথা জগদ্বিখ্যাত হলেও, ভারতের অন্যতম প্রাচীন এবং দূরত্বের নিরিখে দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রাটি যে আমাদের এই বাংলাতেই অনুষ্ঠিত হয়, তা অনেকেরই অজানা। ১৭৩০-এর দশক থেকে চলে আসা এই উৎসবটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং বাংলার স্থাপত্য, লৌকিক বিশ্বাস এবং প্রগতিশীল সমাজচিন্তার এক জীবন্ত দলিল।

১. ভূমিকা: বাংলার এক প্রাচীন ঐতিহ্যের হাতছানি

১৭৩০ থেকে ১৭৪০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শ্রী শ্রী বৃন্দাবন চন্দ্র জিউ মঠের স্বামী মধুসূদনানন্দ এই রথযাত্রার সূচনা করেছিলেন। হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রাচীন জনপদটি কেবল রথযাত্রার জন্যই নয়, বরং বাংলার সামাজিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের সাক্ষী। উল্লেখ্য যে, এই গুপ্তিপাড়াই হলো বাংলার প্রথম ‘বারোয়ারি’ বা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত দুর্গাপূজার (১৭৯০ সাল) সূতিকাগার। সেই একই জনমুখী ও উৎসবমুখর চেতনা কাজ করে এখানকার রথযাত্রাতেও। জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার পুণ্যলগ্নে ‘স্নানযাত্রা’র মাধ্যমে দেবতাকে স্নান করিয়ে যে উৎসবের সূচনা হয়, তার চূড়ান্ত উন্মাদনা দেখা যায় আষাঢ়ের রথযাত্রায়।

২. স্থাপত্যের বিস্ময়: শাল ও বাবলার তৈরি নবরত্ন রথ

গুপ্তিপাড়ার রথটি বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘নবরত্ন’ মন্দির স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। বর্তমান ৩৬ ফুট উঁচু এই রথটির স্থাপত্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। এর ভিত্তি ৩৪ ফুট বাই ৩৪ ফুট বর্গাকার এবং এটি চারতলা বিশিষ্ট। রথটির মূল কাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে অত্যন্ত মজবুত শাল কাঠ (Shorea robusta), আর এর বিশাল ১৬টি চাকা তৈরি হয়েছে বাবলা কাঠ (Vachellia nilotica) দিয়ে।

রথটির একটি বিশেষত্ব হলো এর অধিষ্ঠিত দেবতা। যদিও এটি জগন্নাথদেবের রথযাত্রা হিসেবে পরিচিত, তবে মঠের প্রধান আরাধ্য দেবতা রাধারমণ জিউ-কেই রথের ওপর প্রধান আসনে বসানো হয়। স্থাপত্যগতভাবে রথটি এতটাই মূল্যবান যে, বছরের বাকি সময় এটি একটি বিশালাকার ধাতব খাঁচায় তালাবদ্ধ অবস্থায় সুরক্ষিত থাকে। উৎসবের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে একে বের করে নতুন করে সাজিয়ে তোলার কাজ শুরু হয়।

৩. ভাণ্ডার লুট: যখন ভক্তি আর আনন্দ মিলেমিশে একাকার

গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো ‘ভাণ্ডার লুট’। এটি উল্টোরথের আগের দিন জগন্নাথদেবের মাসির বাড়িতে (গোসাইগঞ্জ বারাবাজার) অনুষ্ঠিত হয়। ৪০০-র বেশি মাটির মালসায় নিবেদন করা খিচুড়ি, লাবড়া, পায়েস ও মালপোয়ার ভোগ ভক্তদের লুটে নেওয়ার এই উন্মাদনা বাংলার আর কোথাও দেখা যায় না। পৌরাণিক বিশ্বাস মতে, মা লক্ষ্মী জগন্নাথদেবের ওপর অভিমান করে মাসির বাড়ির ভাণ্ডার লুট করেন, যাতে দেবতা দ্রুত মন্দিরে ফিরে আসেন।

এই প্রথাটির সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৮৫৮ সালের এক ঐতিহাসিক নথিতে দেখা যায়, সেই সময় প্রায় এক লক্ষ (১,০০,০০০) ভক্ত এই ভাণ্ডার লুটে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রথা অনুযায়ী, স্থানীয় সদগোপ (কৃষিজীবী) সম্প্রদায়ের পুরুষেরা খালি গায়ে লাঠি হাতে প্রতীকীভাবে মন্দিরে প্রবেশ করে এই প্রসাদ লুট করেন।

উৎস থেকে পাওয়া এক বর্ণনায় বলা হয়েছে:

"বিকেল ৫টার দিকে মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়ার সাথে সাথে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনার সৃষ্টি হয়। কয়েকশ মাটির মালসা ভর্তি প্রসাদ লুটে নেওয়ার জন্য সদগোপ সম্প্রদায়ের ভক্তরা ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই প্রসাদ সংগ্রহ করা অত্যন্ত ভাগ্যের ব্যাপার, তাই ঐদিন গুপ্তিপাড়ার ঘরে ঘরে উনুন জ্বলে না, সবাই এই লুটের প্রসাদেই তৃপ্ত হন।"

৪. ১৩ থেকে ৯: একটি দুর্ঘটনার স্মৃতি বহনকারী চূড়া

ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারায় এই রথের কাঠামোতেও আমূল পরিবর্তন এসেছে। অতীতে এই রথটি ১৩টি চূড়া বা শিখর বিশিষ্ট ছিল। কিন্তু ১৮৭৩ সালে রথযাত্রার সময় একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। সেই দুর্ঘটনায় মঠের তৎকালীন দণ্ডীস্বামী স্বামী পৃথানন্দ রথের তলায় চাপা পড়ে প্রাণ হারান। এই শোকাবহ ঘটনার পর রথের ভারসাম্য ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এর উচ্চতা কিছুটা কমিয়ে শিখর সংখ্যা ১৩ থেকে কমিয়ে ৯ করা হয়। সেই থেকেই এটি ‘নবরত্ন’ শৈলী ধারণ করে চলেছে, যা আজ একটি নিরাপত্তা-চালিত স্থাপত্য বিবর্তনের প্রতীক।

৫. দূরত্বের নিরিখে পুরীর পরেই যার স্থান

পুরীর জগন্নাথধামের পর গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রাই ভারতের দ্বিতীয় দীর্ঘতম পথ অতিক্রম করে। বৃন্দাবন চন্দ্র জিউ মঠ থেকে শুরু করে গোসাইগঞ্জ বারাবাজারের মাসির বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ১.৫ কিলোমিটার পথ এই রথ টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতি বছর বর্ধমান, নদীয়া, হাওড়া এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলা থেকে হাজার হাজার ভক্ত এখানে ভিড় জমান। কাদা-মাখা রাস্তায় খালি পায়ে রথের রশি টানার যে আবেগ, তা দেখার মতো। এই বিপুল জনসমাগম গুপ্তিপাড়াকে কেবল একটি গ্রাম নয়, বরং একটি আঞ্চলিক মিলনক্ষেত্রে পরিণত করে।

৬. লিঙ্গ সাম্য ও বিশেষ রশি: নারীদের বিশেষ অংশগ্রহণ

গুপ্তিপাড়ার ঐতিহ্যের একটি অত্যন্ত প্রগতিশীল ও উদার দিক হলো রশি টানার ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সংরক্ষিত অধিকার। রথ টানার জন্য ব্যবহৃত ৩০০ ফুট লম্বা চারটি প্রধান রশির মধ্যে একটি রশি সম্পূর্ণভাবে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট থাকে। বৈষ্ণব ধর্মের উদারতা এবং তৎকালীন বাংলার সমাজব্যবস্থায় নারীর মর্যাদার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আজও টিকে আছে এই অনন্য প্রথা।

৭. উপসংহার: ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও আগামী দিনের ভাবনা

গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক অমূল্য উত্তরাধিকার। তবে সময়ের আবর্তে এই প্রাচীন কাষ্ঠ-স্থাপত্যটি আজ ক্ষয়ে যাচ্ছে। ২০১২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, রথটির অবস্থা অত্যন্ত জরাজীর্ণ। মঠের পক্ষ থেকে প্রতি বছর অস্থায়ী মেরামত করা হলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ (ASI) ও প্রশাসনের সক্রিয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

আজকের আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের কাছেই একটি প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন—যে ঐতিহ্যের শেকড় ৩০০ বছরের প্রাচীন, যা আমাদের সমাজকে একতাবদ্ধ করে, তাকে কি আমরা যথাযথ সুরক্ষা দিতে পারছি? গুপ্তিপাড়ার রথের চাকা যেন কেবল দেবতার যাত্রাপথ নয়, বরং আমাদের হারানো ইতিহাসের পুনরুদ্ধারের বার্তাও বহন করে আনে।

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

  গাছতলার মেয়েটি আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও...