আরোহী
আমি আজ যে ঘটনাটা বলতে যাচ্ছি, সেটা কোনো গল্প নয়। এটা আমার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া এমন একটা ঘটনা, যেটার ব্যাখ্যা আজও আমি খুঁজে পাইনি। আপনি বিশ্বাস করবেন কি করবেন না, সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার। কিন্তু আমি যা বলব, তার একটা শব্দও বাড়িয়ে বলছি না। ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগের। তখন আমি একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতাম। কাজের জন্য প্রায়ই গ্রামের দিকে যেতে হতো। একদিন অফিস থেকে খবর এল, পাশের জেলার একটা প্রত্যন্ত এলাকায় জরুরি কাজ আছে। সকালে গিয়ে কাজ শেষ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। স্থানীয় লোকেরা বলল, "ভাই, আজ আর বের হবেন না। এই রাস্তা দিয়ে রাতে কেউ যায় না।" আমি হেসে বললাম, "এখনো এসব বিশ্বাস করেন নাকি?" ওরা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে শুধু বলেছিল, "যাওয়ার আগে একবার ভেবে নিন।" আমি পাত্তা দিইনি। রাত তখন প্রায় সাড়ে নয়টা। চারপাশে এমন নীরবতা, যেন পুরো পৃথিবীতে আমি একাই আছি। বাইক চালিয়ে এগোচ্ছিলাম। রাস্তার দুপাশে বিশাল বড় বড় গাছ। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম... রাস্তার মাঝখানে সাদা কাপড় পরা একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভাবলাম, হয়তো কোনো পথচারী। কাছে যেতেই সে ধীরে ধীরে রাস্তার একপাশে সরে গেল। আমি বাইক নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে এলাম। কিন্তু পাঁচ মিনিট পর... আবার সেই একই মানুষ। একই সাদা কাপড়। একইভাবে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে। এবার আমার একটু অস্বস্তি লাগল। আমি মনে মনে ভাবলাম, এত দ্রুত সে এখানে এল কীভাবে? তবুও কিছু না ভেবে আবার পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম। আরও কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ আমার বাইক নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। অনেক চেষ্টা করলাম। স্টার্ট নিচ্ছে না। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঠিক তখনই... আমার কানে ভেসে এল... কারও হাঁটার শব্দ। টুপ... টুপ... টুপ... শব্দটা ক্রমশ আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি মোবাইলের টর্চ জ্বালালাম। কেউ নেই। শব্দ বন্ধ। টর্চ বন্ধ করতেই আবার... টুপ... টুপ... টুপ... এবার মনে হচ্ছিল, ঠিক আমার পিছনেই কেউ হাঁটছে। সাহস করে পিছনে তাকালাম। কেউ নেই। কিন্তু হঠাৎ একটা ঠান্ডা বাতাস আমার শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে গেল। এমন ঠান্ডা, যেন বরফের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি। আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। ঠিক তখনই... আমার মোবাইল নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। ব্যাটারি ছিল প্রায় আশি শতাংশ। অন্ধকারে আমি একদম একা। হঠাৎ... একটা মেয়ের হাসির শব্দ। খুব ধীরে... খুব কাছে... "হিহিহি..." আমি স্থির হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর সেই হাসি কান্নায় বদলে গেল। তারপর... কেউ যেন খুব আস্তে করে বলল— "আমাকে... দেখছ?" আমার বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল। আমি কিছু বলতে পারছিলাম না। ঠিক তখনই আমার বাইকের রিয়ার ভিউ মিররে চোখ পড়ল। আর যা দেখলাম... আজও ভুলতে পারিনি। মিররে আমার পেছনে একজন দাঁড়িয়ে। লম্বা চুল। সাদা কাপড়। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু আমি যখন ঘুরে পিছনে তাকালাম... সেখানে কেউ নেই। আবার মিররে তাকাতেই... সে আরও কাছে। এবার তার মাথাটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগল। চুলের ফাঁক দিয়ে দুটো ফ্যাকাসে চোখ আমার দিকে তাকিয়ে। আমি জীবনে এত ভয় কখনও পাইনি। আমি চোখ বন্ধ করে শুধু একটা প্রার্থনা করতে লাগলাম। হঠাৎ... আমার বাইক নিজে থেকেই স্টার্ট হয়ে গেল। আমি আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াইনি। যেভাবে পারি, সোজা বাইক নিয়ে ছুটলাম। পেছনে তাকানোর সাহস হয়নি। প্রায় বিশ মিনিট পর একটা চায়ের দোকানের সামনে এসে থামলাম। দোকানদার আমাকে দেখে বললেন, "আপনি কি ওই জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে এসেছেন?" আমি অবাক হয়ে বললাম, "হ্যাঁ... কিন্তু আপনি বুঝলেন কীভাবে?" তিনি আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললেন, "আপনার কাঁধে হাতের ছাপ আছে।" আমি সঙ্গে সঙ্গে কাঁধে হাত দিলাম। কিছুই অনুভব করলাম না। দোকানদার একটা আয়না এগিয়ে দিলেন। আমি আয়নায় তাকিয়ে দেখলাম... আমার ডান কাঁধে পাঁচটা কালচে আঙুলের দাগ। যেন কেউ শক্ত করে চেপে ধরেছিল। পরদিন সকালে সাহস করে আবার সেই এলাকায় গিয়েছিলাম। সেখানকার এক বৃদ্ধ আমাকে বললেন, অনেক বছর আগে ওই রাস্তায় একটা মেয়ের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল। তারপর থেকে নাকি মাঝে মাঝেই গভীর রাতে মানুষ সাদা পোশাক পরা এক নারীর মতো অবয়ব দেখতে পায়। কেউ বলে সে পথ আটকে দাঁড়ায়, কেউ বলে শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। এসব কথার সত্যতা আমি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারিনি, তাই এগুলোকে স্থানীয় লোককথা হিসেবেই শুনেছিলাম। আজও আমি জানি না, সেদিন রাতে আমি আসলে কী দেখেছিলাম। হয়তো সবই ছিল ভয়, ক্লান্তি আর অন্ধকারের প্রভাব। আবার হয়তো... সত্যিই এমন কিছু ছিল, যার ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই। সেই ঘটনার পর আমি আর কখনও ওই রাস্তা দিয়ে রাতে যাইনি। আর আজও গভীর রাতে যদি কোথাও সাদা পোশাক পরা কাউকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি... আমি থামি না। কারণ আমি জানি— সব মানুষকে দূর থেকে যেমন দেখা যায়, কাছে গিয়েও তারা ঠিক তেমন নাও হতে পারে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.