ক্ষমা নেই
রাহুল আর দীপার প্রেমটা শুরু হয়েছিল কলেজের শেষ বর্ষে। দীপার ভালোবাসায় কোনও খাদ ছিল না—প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা সিদ্ধান্তে সে শুধু রাহুলকেই ভাবত। কিন্তু রাহুল ছিল সন্দেহবাতিকগ্রস্ত। ফোনের প্রতিটা মেসেজ, প্রতিটা মিসড কল তার কাছে অপরাধের প্রমাণ মনে হতো। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, দীপা তাকে অন্ধকারে রেখে অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে। সেই রাতেও একই তর্ক শুরু হয়েছিল। দীপার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছিল—আসলে সেটা ছিল তার বসের অফিসিয়াল নম্বর, কিন্তু রাহুল তা শুনতে রাজি হয়নি। তর্ক গড়াতে গড়াতে একসময় রাহুলের হাত দুটো দীপার গলা চেপে ধরে। দীপা ছটফট করেছিল, প্রাণপণে চেষ্টা করেছিল নিজেকে বাঁচানোর, কিন্তু রাহুলের রাগ আর সন্দেহের আগুন তখন এতটাই তীব্র যে সে থামেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই দীপার শরীর নিস্তেজ হয়ে যায়। নিজের কাজের ভয়াবহতা বুঝতে রাহুলের বেশি সময় লাগেনি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সে ঠিক করল, লাশ লোপাট করতে হবে—এমন জায়গায়, যেখানে কেউ কখনও খুঁজে পাবে না। গভীর রাতে, প্লাস্টিকে মুড়ে দীপার নিথর দেহ গাড়ির পিছনের সিটে তুলে রাহুল বাড়ি থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে এক ঘন জঙ্গলের দিকে রওনা দেয়। রাস্তায় একটাও গাড়ি চোখে পড়েনি, যেন গোটা পৃথিবী সেই রাতে তার সহযোগী হয়ে উঠেছে। জঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছে, যতটা সম্ভব ভেতরে গাড়িটা নিয়ে যায় রাহুল। গাছের ডালপালায় গাড়ির গা ঘষটে যাচ্ছিল, কিন্তু থামেনি সে। একটা নির্জন জায়গায় এসে গাড়ি দাঁড় করায়। হেডলাইট নিভিয়ে দেয়, কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ করার সাহস হয় না—অন্ধকারে একা, নিস্তব্ধতার মধ্যে ইঞ্জিনের শব্দটুকুই যেন তার একমাত্র ভরসা। পিছনের দরজা খুলে, প্লাস্টিকে মোড়া লাশটা টেনে নামায়। তারপর জঙ্গলের আরও গভীরে, মাটিতে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। শুকনো পাতা আর ডালপালার ওপর দিয়ে ভারী শরীরটা টানতে টানতে রাহুলের হাত-পা কাঁপছিল, কপাল বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছিল অনবরত। এক জায়গায় এসে সে থামে। প্রচণ্ড পরিশ্রম আর উত্তেজনায় হাঁপাতে হাঁপাতে লাশের পাশেই বসে পড়ে। কিছুক্ষণ চোখ বুজে বসে থাকে। ধীরে ধীরে তার শ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে, আর সঙ্গে সঙ্গে মনে একটা অদ্ভুত স্বস্তি নেমে আসে। এই খুনের কথা আর কেউ জানবে না। পুলিশও আমার নাগাল পাবে না। এই ভাবনাতেই আপনমনে হেসে ওঠে রাহুল। জঙ্গলের নিস্তব্ধতায় তার সেই হাসি অদ্ভুত রকম প্রতিধ্বনিত হয়। আর ঠিক তখনই ঘটে সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা। তার পাশে পড়ে থাকা প্লাস্টিক মোড়া দেহটা একটু একটু করে নড়তে শুরু করে। প্রথমে যেন সামান্য কাঁপুনি, তারপর ধীরে ধীরে নড়াচড়া বাড়তে থাকে। রাহুল প্রথমে ভাবে তার চোখের ভুল। কিন্তু না—প্লাস্টিকের ভেতর থেকে স্পষ্ট নড়াচড়ার শব্দ আসছে। আচমকা লাশটা উঠে বসে। রাহুলের রক্ত জমে যায় শরীরে। জঙ্গলের অন্ধকারেও সে স্পষ্ট দেখতে পায়, প্লাস্টিকের আবরণ ছিঁড়ে দীপার মুখ বেরিয়ে আসছে—সেই মুখ, যা এখন আর আগের মতো নেই। চোখদুটো রক্তলাল, ত্বক কালচে হয়ে গেছে। একটা ভাঙা, ফিসফিসে অথচ ভয়ঙ্কর কণ্ঠস্বর জঙ্গলের নিস্তব্ধতা চিরে দেয়— "আমাকে মেরে তুই বাঁচবি ভেবেছিস? তোকেও আজ আমি ফিরতে দেব না।" লাশটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার দুটো কালো হয়ে যাওয়া হাত সাঁড়াশির মতো রাহুলের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। রাহুল পিছাতে চেষ্টা করে, কিন্তু তার পা যেন মাটিতে গেঁথে গেছে। চিৎকার করতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে কোনও শব্দ বের হয় না। প্রচণ্ড আতঙ্কে তার বুকের ভেতর একটা তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। হৃৎপিণ্ড যেন ফেটে যাচ্ছে। ছটফট করতে করতে, দুহাতে বুক খামচে ধরে রাহুল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শরীর নিস্তব্ধ হয়ে যায়—জঙ্গলের সেই অন্ধকারে, ঠিক যেখানে দীপার নিথর দেহ পড়েছিল, তারই পাশে। পরদিন সকালে যখন পুলিশের গাড়ি জঙ্গলের কাছে এসে থামে, তখনও রাহুলের গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়নি। সামনের এবং পিছনের দুটো দরজাই হাট করে খোলা। মাটিতে স্পষ্ট একটা ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগ। সেই দাগ অনুসরণ করেই পুলিশ জঙ্গলের গভীরে পৌঁছয়। আর সেখানে, পাশাপাশি পড়ে থাকা অবস্থায় উদ্ধার হয় দুটি দেহ—একটি প্লাস্টিকে মোড়া, অন্যটি খোলা আকাশের নিচে, আতঙ্কে বিকৃত মুখ নিয়ে। তদন্তকারী অফিসাররা পরে বলেছিলেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে রাহুলের মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় হৃদযন্ত্রের আকস্মিক ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া। কিন্তু ঠিক কী দেখে, বা কী কারণে সেই রাতে জঙ্গলের নির্জনতায় তার হৃৎপিণ্ড থেমে গিয়েছিল—তার কোনও ব্যাখ্যা আজও পুলিশের ফাইলে লেখা নেই। গ্রামের মানুষ আজও বলে, অমাবস্যার রাতে ওই জঙ্গলের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে শোনা যায় এক নারীকণ্ঠের ফিসফিসানি— "তোকেও আমি ফিরতে দেব না..."
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.