পুরুলিয়ার ধূসর প্রান্তরে লুকানো ৫টি বিস্ময়কর রহস্য: ১ লক্ষ বছরের প্রাচীন ইতিহাস থেকে ডুবন্ত মন্দির
১. ভূমিকা
পুরুলিয়া বললেই পর্যটকদের চোখে ভেসে ওঠে পলাশ রাঙা বনভূমি আর রুক্ষ পাহাড়ের ছবি। কিন্তু একজন ঐতিহাসিকের কাছে এই জেলাটি কেবল প্রকৃতির লীলাভূমি নয়, বরং 'বিচিত্র সংস্কৃতির এক মোজাইক'। প্রাচীনকালে 'বজ্রভূমি' নামে পরিচিত এই জনপদটি ছিল ১৬টি মহাজনপদের অন্যতম এক অংশ। আধুনিক পুরুলিয়ার শান্ত ধূসর প্রান্তরের নিচে চাপা পড়ে আছে এমন সব রহস্য, যা আমাদের মানব সভ্যতার চেনা ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করে। কীভাবে একটি আধুনিক জেলা তার অরণ্যের গভীরে ১ লক্ষ বছরের প্রাচীন রহস্য থেকে শুরু করে আধুনিক সংগ্রামের আখ্যান লুকিয়ে রাখতে পারে? চলুন, আজ আমরা উন্মোচন করি পুরুলিয়ার সেই বিস্ময়কর এবং বৈচিত্র্যময় ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলো।
২. ১ লক্ষ বছরের অবিচ্ছিন্ন মানব ইতিহাস: অযোধ্যা পাহাড়ের বিস্ময়
সাধারণত মনে করা হয় যে প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ কেবল যাযাবর ছিল এবং খাবারের খোঁজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াত। কিন্তু গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের অনুসন্ধান এবং অযোধ্যা পাহাড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এই ধারণাটিকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সেখানে পাওয়া বড় পাথরের সরঞ্জামের পাশাপাশি ‘মাইক্রো ব্লেড ইন্ডাস্ট্রি’ বা ক্ষুদ্র প্রস্তর সরঞ্জামের অস্তিত্ব এক নিরবচ্ছিন্ন বসবাসের ইঙ্গিত দেয়।
অযোধ্যা পাহাড় ও পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে পাওয়া এই নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে যে, আজ থেকে প্রায় ৮০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ বছর আগে থেকেই এই অঞ্চলে মানুষ বসবাস শুরু করেছিল এবং তারা দীর্ঘ সময় ধরে এখানে স্থায়ীভাবে ছিল। এটি সেই প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেয় যে প্রাচীন মানুষ কেবল যাযাবর ছিল। এই ‘অবিচ্ছিন্ন মানব ইতিহাস’ পুরুলিয়াকে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন মানব বসতির মর্যাদা দেয়।
"অযোধ্যা পাহাড়ের এই ‘মাইক্রো ব্লেড ইন্ডাস্ট্রি’ বা ক্ষুদ্র প্রস্তর সরঞ্জাম শিল্প মূলত লেট প্লেইস্টোসিন (Late Pleistocene) যুগের। ২০,০০০ থেকে ১০,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের এই সরঞ্জামগুলোর সাথে পুরনো প্রস্তর যুগের (৮০,০০০-১,০০,০০০ বছর আগের) বড় সরঞ্জামের সহাবস্থান প্রমাণ করে যে এই অঞ্চলে মানুষের বসবাস ছিল নিরবচ্ছিন্ন।"
৩. জৈন ধর্মের সুবর্ণযুগ এবং মহাবীরের পদচিহ্ন
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে পুরুলিয়ার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় শুরু হয়। জৈন ধর্মের ২৪তম তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর স্বয়ং এই 'রাঢ় দেশ' ভ্রমণ করেছিলেন, যার উল্লেখ পাওয়া যায় ‘আচারাঙ্গ সূত্র’ এবং ‘কল্পসূত্র’-এর মতো প্রাচীন জৈন গ্রন্থে। যদিও শুরুতে এখানকার আদিবাসীদের সাথে তাঁর সংঘাতের কথা জানা যায়, কিন্তু কালক্রমে এই অঞ্চল জৈন ধর্মের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
১০৭৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা অনন্তবর্মন চোলগঙ্গ দেবের পৃষ্ঠপোষকতায় এই অঞ্চলে জৈন ধর্মের সুবর্ণযুগ শুরু হয়। তিনি একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জুড়ে জৈন ধর্মের 'দিগম্বর' সম্প্রদায়ের জন্য অসংখ্য মন্দির নির্মাণ করেন। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর পর ওড়িশার রাজারা যখন ব্রাহ্মণ ধর্মের অনুসারী হন, তখন এক অদ্ভুত ধর্মীয় রূপান্তর ঘটে। বহু জৈন মন্দির কালক্রমে শিব বা বিষ্ণুর মন্দিরে রূপান্তরিত হয়। জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তিগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে বিকৃত করে হিন্দু দেবতা হিসেবে পূজা করা শুরু হয়—যা এই অঞ্চলের ধর্মীয় বিবর্তনের এক জটিল ও বিস্ময়কর ইতিহাস।
৪. অরণ্যের গভীরে লুকানো স্থাপত্য: দেউলঘাটা ও বান্দার মন্দির
পুরুলিয়ার গভীর অরণ্যের মাঝে লুকিয়ে আছে স্থাপত্যের অনন্য কিছু নিদর্শন। এর মধ্যে দেউলঘাটা এবং বান্দার মন্দির স্থাপত্য ও ইতিহাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
- দেউলঘাটা: রাঁচি-পুরুলিয়া রোড থেকে গড় জয়পুর হয়ে যখন আপনি পদব্রজে বা 'পদযাত্রা' (padyatra) করে বনের গভীরে প্রবেশ করবেন, তখন হঠাৎই গাছের আড়াল থেকে জেগে উঠবে দেউলঘাটার সেই সুউচ্চ ধ্বংসাবশেষ। নিচের ছবিতে দেউলঘাটার সেই শৈল্পিক কারুকার্য দেখা যাচ্ছে, যেখানে ইট ও স্টাকোর (stucco) সূক্ষ্ম কাজ আজও বিস্ময় জাগায়। যদিও ২০০২ সালে একটি মন্দির ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু বর্তমানে টিকে থাকা দুটি মন্দিরে এখনো ‘রাজহাঁস’, ‘কীর্তিমুখ’ এবং মস্তকহীন উপবিষ্ট মূর্তির মতো অপূর্ব জ্যামিতিক নকশা চোখে পড়ে।
- [SOURCE_IMAGE_4]
- বান্দা: বান্দা গ্রামে অবস্থিত একাকী দাঁড়িয়ে থাকা লাল বেলেপাথরের এই জৈন মন্দিরটি স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এর পিরামিড সদৃশ চূড়া এবং কালো পাথরে খোদাই করা মহাবীরের ধ্যানমগ্ন মূর্তি পর্যটকদের আবিষ্ট করে। নিচে বান্দার সেই নিঃসঙ্গ কিন্তু গর্বিত স্থাপত্যের দৃশ্য:
- [SOURCE_IMAGE_12]
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ডেভিড ম্যাককাচিয়ন তাঁর "Late Medieval Temples of Bengal" গ্রন্থে এই মন্দিরগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে লিখেছিলেন:
"পুরানো মানভূম জেলার এই প্রত্যন্ত পশ্চিম অঞ্চলগুলোতে জৈনরা সম্ভবত ১৩শ শতাব্দী বা তার পরবর্তী সময় পর্যন্ত মন্দির নির্মাণ অব্যাহত রেখেছিল, যার বেশ কিছু আজও টিকে আছে..."
৫. কুশবনী ও বুড়িশোল: যেখানে ইতিহাস ও বর্তমান মিলেমিশে যায়
পুরুলিয়ার কুশবনী এবং বুড়িশোল জঙ্গল কেবল প্রাচীন ইতিহাসেরই অংশ নয়, বরং এটি আধুনিক ইতিহাসের এক জটিল সীমান্ত। এই ঘন অরণ্যগুলো একসময় প্রাচীন মানুষের পরিযানের পথ ছিল, কিন্তু আধুনিক সময়ে এটি হয়ে ওঠে 'কম্বিং অপারেশন' বা চিরুনি তল্লাশির মতো রুদ্ধশ্বাস ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু। ২০১১ সালে কুশবনী ও বুড়িশোল জঙ্গলেই মাওবাদী নেতা কিষেনজির জীবনের অবসান ঘটে।
এই বনভূমিগুলো প্রমাণ করে যে পুরুলিয়া কেবল পাথরে লেখা প্রাচীন ইতিহাস নয়; এটি এমন এক ভূখণ্ড যেখানে প্রাচীন অরণ্যের নিস্তব্ধতা আধুনিক রাজনৈতিক সংগ্রামের আখ্যানকে আগলে রেখেছে। যারা আজ এই বনের গভীরে পদযাত্রা করেন, তারা একই সাথে হাজার বছরের প্রাচীন রহস্য এবং সমসাময়িক ইতিহাসের স্পন্দন অনুভব করতে পারেন।
৬. তেলকুপির সলিল সমাধি: দামোদরের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া এক নগরী
পুরুলিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বিষাদময় অধ্যায় হলো তেলকুপির সলিল সমাধি। একসময় এটি ছিল শিখর রাজবংশের (Sikhara Dynasty) রাজা রুদ্রশিখরের রাজধানী, যা সংস্কৃত সাহিত্যে ‘তৈলকম্প’ নামে পরিচিত। ১০ম-১১শ শতাব্দীর অসংখ্য সুন্দর জৈন মন্দির ও স্থাপত্যে সাজানো ছিল এই সমৃদ্ধ নগরী।
কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC) বাঁধ নির্মাণের ফলে এই সমৃদ্ধ জনপদটি চিরতরে জলের নিচে তলিয়ে যায়। এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না, বরং একটি 'পরিকল্পিত কাজ' ছিল যেখানে এই অমূল্য সম্পদগুলো নথিবদ্ধ করার বা স্থানান্তর করার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। বিশেষ করে 'ভৈরবথান'-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক মন্দিরগুলো আজ দামোদরের গর্ভে চিরনিদ্রায় শায়িত। তেলকুপির এই হারিয়ে যাওয়া বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি এবং এক ট্র্যাজিক অধ্যায়।
৭. উপসংহার
পুরুলিয়া কেবল একটি রুক্ষ ভূখণ্ড নয়; এটি এক অবহেলিত এবং বিশাল খোলা জাদুঘর। ১ লক্ষ বছরের প্রাচীন প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে দামোদরের নিচে তলিয়ে যাওয়া তেলকুপির ইতিহাস—সবই এই মাটির গভীরে মিশে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের এই জীর্ণ উত্তরাধিকারকে যথাযথ সম্মান দিতে পারছি? পুরুলিয়ার এই ধূসর প্রান্তরে লুকিয়ে থাকা রহস্যগুলো উন্মোচনের জন্য আজও প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত খনন এবং যথাযথ সংরক্ষণ। আমাদের এই আবহমান ঐতিহ্য কি সময়ের ধুলোয় এভাবেই হারিয়ে যাবে?

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.