বাঁকুড়ার লুকানো রত্ন: হাদল-নারায়ণপুরের টেরাকোটা মন্দিরের ৫টি বিস্ময়কর কাহিনী
বাঁকুড়া বললেই ভ্রমণপিপাসু বাঙালির মানসপটে ভেসে ওঠে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের ইতিহাস এবং সেই অনন্য স্থাপত্যের সুষমা। তবে সেই সুপরিচিত পর্যটন কেন্দ্রের ছায়া থেকে বেরিয়ে নাতিদূরেই অবস্থান করছে এক বিস্ময়কর স্থাপত্যের খনি—হাদল-নারায়ণপুর। বিষ্ণুপুর থেকে মাত্র ৩৮ কিলোমিটার এবং বাঁকুড়া শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই যমজ গ্রামটি আজও আধুনিক পর্যটনের ভিড় থেকে দূরে এক 'লুকানো রত্ন' হয়ে বিরাজমান। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি শেষে যখন গ্রামটির শান্ত পরিবেশে টেরাকোটার নিপুণ কারুকার্য নয়নগোচর হয়, তখন এক অনাবিল আবিষ্কারের আনন্দে মন আপ্লুত হতে বাধ্য।
১. অরণ্য থেকে জনপদ: 'মুড়োকাটা' চক্রবর্তীর কিংবদন্তি
হাদল-নারায়ণপুর গ্রামের পত্তনের ইতিহাস যেমন প্রাচীন, তেমনই রোমাঞ্চকর। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই অঞ্চলটি একসময় নিবিড় অরণ্যে আবৃত ছিল। জনৈক 'মুড়োকাটা' চক্রবর্তী নামক এক ব্যক্তিত্ব নিজ অসামান্য পরিশ্রমে ও সংকল্পে ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে এই জনপদ গড়ে তোলেন। জঙ্গল সাফ করার সময় তিনি গাছের 'মুড়ো' বা গোড়া কেটে পথ তৈরি করতেন বলেই সম্ভবত তাঁর এমন বিচিত্র নামকরণ হয়েছিল।
একটি স্থানের নাম কীভাবে তার উৎপত্তির শ্রম ও সংগ্রামের স্মৃতির সাথে জড়িয়ে থাকে, এই কাহিনীটি তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এই কিংবদন্তি কেবল কোনো গল্প নয়, বরং এটি বাংলার গ্রামীণ জনপদ গড়ে ওঠার পেছনে মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক সাংস্কৃতিক দলিল যা আজও স্থানীয় জনমানসে অমলিন হয়ে আছে।
২. ঘোষ থেকে মণ্ডল: নীল চাষ এবং ভাগ্যের পরিবর্তন
গ্রামটির সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগ সূচিত হয়েছিল মণ্ডল পরিবারের হাত ধরে। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে বর্ধমানের নীলপুর থেকে মুচিরাম ঘোষ নামক এক ব্যক্তি এই গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর ভাগ্য পরিবর্তনের সূচনা হয় তৎকালীন প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ শুভঙ্কর দাসের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে। সোর্সে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী:
"মুচিরাম ঘোষ এবং শুভঙ্কর দাসের মধ্যে এক গভীর বন্ধন গড়ে ওঠে, যা এই পরিবারের ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিপুল ভূসম্পত্তির অধিকারী হয়ে মুচিরাম নীল চাষের মাধ্যমে প্রভূত অর্থ ও প্রতিপত্তি অর্জন করেন। মল্ল রাজা গোপাল সিং-এর আশীর্বাদে তিনি 'মণ্ডলপতি' (রাজস্ব সংগ্রাহক) পদে অধিষ্ঠিত হন এবং মল্লরাজের নির্দেশেই পরিবারের পদবি 'ঘোষ' থেকে 'মণ্ডলে' রূপান্তরিত হয়।"
৩. সপ্তদশ-রত্ন রাসমঞ্চ: ১৭টি চূড়ার এক অনন্য স্থাপত্য
বড় তরফের প্রধান আকর্ষণ হলো মণ্ডল বাড়ির বিশাল অট্টালিকার সম্মুখে অবস্থিত ৪০ ফুট উচ্চতার রাসমঞ্চটি। ১৮৫৪ সালে নির্মিত এই অষ্টভুজাকৃতি দ্বিতল কাঠামোটি বাংলার মন্দির স্থাপত্যের এক বিরল নিদর্শন। এর বিশেষত্ব হলো এর ১৭টি চূড়া বা 'সপ্তদশ-রত্ন' শৈলী, যেখানে কারুকার্যমণ্ডিত 'রেখ' স্টাইলের বুরুজ বা চূড়া লক্ষ্য করা যায়। ৫ ফুট উঁচু ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই মঞ্চটির আটটি দিকের দেওয়ালেই খোদাই করা হয়েছে পৌরাণিক কাহিনীর নিপুণ সব টেরাকোটা প্যানেল:
- গজলক্ষ্মী ও অনন্তশয়ন বিষ্ণু
- রাম-সীতা এবং রাধা-কৃষ্ণ (কৃষ্ণ রাধিকা)
- মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা
- শিবের বিবাহ এবং শিব-নন্দী-ভৃঙ্গী
- গোষ্ঠলীলার অনুপম দৃশ্য
দুর্ভাগ্যবশত, দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলার কারণে এই 'সপ্তদশ-রত্ন' কাঠামোর অনেক সূক্ষ্ম কারুকাজ আজ বিলীয়মান। যথাযথ সংরক্ষণের অভাব এই অমূল্য সম্পদগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।
৪. নদীর কাদা থেকে দেবীর উত্থান: ব্রাহ্মণী দেবীর মন্দির
গ্রামের প্রবেশ পথেই নয়নগোচর হয় প্রায় ৩৫০ বছরের প্রাচীন ব্রাহ্মণী দেবীর মন্দির। দেবী ব্রাহ্মণীকে এখানে দুর্গারই এক রূপ হিসেবে আরাধনা করা হয়। লোকগাথা অনুযায়ী, এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশ। গ্রামের এক পুণ্যবতী মহিলা রানী ময়রা স্বপ্নে দেবীর নির্দেশ পান। সেই নির্দেশানুসারে গ্রামবাসী নিকটস্থ দামোদর নদের তীরের কাদা থেকে একটি কালো পাথরের বিগ্রহ উদ্ধার করেন (উল্লেখ্য যে গ্রামটি বোধাই নদীর তীরে হলেও মূর্তিটি দামোদর থেকে উদ্ধার করা হয়)।
এই মন্দিরের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে নজর কাড়ে এর শিখরে অবস্থিত টেরাকোটার কাজ। সেখানে মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যের এক জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেখানে তিনি দেবী সতীকে স্কন্ধে নিয়ে নৃত্যরত।
৫. গ্রাম্য স্থাপত্যে ইউরোপীয় ছোঁয়া: মণ্ডলেদের রাজপ্রাসাদ
বড় তরফের মণ্ডল বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করলে এক অদ্ভুত বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। এখানকার সুবিশাল হলুদ রঙের প্রাসাদে বাংলার ঐতিহ্যবাহী শৈলীর সাথে ইউরোপীয় রীতির এক চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটেছে। প্রাসাদের সিলিন্ডার আকৃতির প্রবেশদ্বার, সুউচ্চ সবুজ রঙের জানালা এবং খিলানগুলোর ওপর অঙ্কিত মানুষের মুখের বিশেষ নকশা (facial motifs) ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলে।
বাংলার এক নিভৃত পল্লিতে এই ধরনের ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যের উপস্থিতি তৎকালীন আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করে। নীল চাষের মাধ্যমে অর্জিত ধনসম্পদ এবং বিশ্ববাণিজ্যের প্রভাব বাংলার জমিদারদের কেবল বিত্তশালীই করেনি, বরং তাঁদের জীবনযাত্রায় ও স্থাপত্য ভাবনায় এক বিশ্বজনীন রুচির জন্ম দিয়েছিল। এই প্রাসাদটি সেই সময়ের এক অনন্য দলিল যেখানে বাঙালি জমিদাররা তাঁদের সনাতন ঐতিহ্যের সাথে ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন।
উপসংহার হাদল-নারায়ণপুর কেবল একটি সাধারণ গ্রাম নয়, এটি বাংলার হারিয়ে যাওয়া গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। টেরাকোটার সূক্ষ্ম আল্পনা থেকে শুরু করে জমিদার বাড়ির রাজকীয় ইউরোপীয় স্থাপত্য—সব মিলিয়ে এই যমজ গ্রাম আমাদের ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। তবে সময়ের করাল গ্রাসে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই শিল্পকৃতিগুলো আজ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এই অবহেলিত স্থাপত্যগুলো সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক ও জাতীয় দায়িত্ব।
আপনাদের কাছে একটি প্রশ্ন: বিষ্ণুপুরের অতি-পরিচিত গণ্ডির বাইরেও আমাদের বাংলার গ্রামগুলোতে এমন কত শত বিস্ময় যে এখনো অজানাই রয়ে গেছে, আমরা কি সেগুলো খুঁজে দেখার চেষ্টা করব?

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.