শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

মরুতীর্থ হিংলাজ: এক মহাকাব্যিক আখ্যান

 



মরুতীর্থ হিংলাজ: মরুভূমির রুক্ষ পথে আত্মা ও অস্তিত্বের এক মহাকাব্যিক আখ্যান

বেলুচিস্তানের মাকরান উপকূলের তপ্ত বালুকা রাশি, সালফারের তীব্র গন্ধ আর দিগন্তজোড়া ধূসর মরুভূমি—এরই মাঝে একাকী হেঁটে চলা এক তান্ত্রিক সন্ন্যাসী, যাঁর অতীত জুড়ে ছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দেওয়া এক দুর্ধর্ষ বিপ্লবীর ছায়া। ১৯৫৪ সালে যখন 'মরুতীর্থ হিংলাজ' প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন তা কেবল বাংলা সাহিত্য জগতেই তোলপাড় সৃষ্টি করেনি, বরং মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক সমাজের তথাকথিত শ্লীলতা ও বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। কালিকানন্দ অবধূতের এই কালজয়ী সৃষ্টি কেবল একটি সাধারণ ভ্রমণকাহিনী নয়; এটি মানুষের গূঢ় লালসা, আধ্যাত্মিক কূটাভাস এবং অস্তিত্বের গভীর সংকটের এক প্রখর মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ। মরুভূমির সেই বীভৎস ও অদ্ভুত রসের আড়ালে কীভাবে এক সন্ন্যাসী মানুষের অন্তরাত্মার দর্পণ তুলে ধরেছিলেন, আজ এক সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদের দৃষ্টিতে আমরা ফিরে দেখব সেই অনন্য আখ্যান।

১. বিপ্লবী রেবতী মোহন থেকে তান্ত্রিক অবধূত: এক মহাকাব্যিক রূপান্তর

'মরুতীর্থ হিংলাজ'-এর স্রষ্টা কালিকানন্দ অবধূতের (প্রকৃত নাম দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়) জীবন কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়েও অধিক নাটকীয়। ১৯১০ সালে কলকাতার ভবানীপুরে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি এককালে কলকাতা পোর্ট কমিশনের সাধারণ স্টোরকিপার ছিলেন। কিন্তু সেই সাধারণ আবরণের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক প্রখর বৈপ্লবিক সত্তা। 'রেবতী মোহন মুখোপাধ্যায়' ছদ্মনামে তিনি সশস্ত্র বিপ্লবীদের অস্ত্র সরবরাহ করতেন। গ্রেফতারি এড়াতে উত্তাল পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মগোপন করার পর প্রায় দুই দশক তিনি ছদ্মবেশে ভারত ও মিয়ানমারের বিভিন্ন প্রান্তে পরিব্রাজক হিসেবে ঘুরে বেড়ান।

ব্যক্তিগত জীবনের তীব্র ট্র্যাজেডি ও স্ত্রীর অকাল মৃত্যু তাঁকে ঠেলে দেয় তন্ত্রের নিগূঢ় পথে। উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরে সন্ন্যাস গ্রহণ করে তিনি হন 'কালিকানন্দ অবধূত'। তাঁর এই পরিবর্তন কেবল নাম পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল তাঁর 'কৌল সাধনা' ও তন্ত্র দর্শনের এক বাস্তব প্রয়োগ। হিমালয় থেকে কুমারিকা পর্যন্ত পরিভ্রমণের সময় তিনি 'অজগর ব্রত' ও 'পক্ষী ব্রত'-র মতো কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন করেছিলেন। অবধূতের এই তান্ত্রিক দর্শন—যেখানে মানুষের দেহকেই ব্রহ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ মন্দির মনে করা হয়—তাই প্রতিফলিত হয়েছে হিংলাজের রুক্ষ মরুপথে হেঁটে চলা রক্তমাংসের চরিত্রগুলোর বর্ণনায়।

২. প্রত্যাখ্যানের ছাই থেকে আকাশচুম্বী সাফল্য: এক ঐতিহাসিক প্রকাশনা আখ্যান

এই উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে আসার পথটিও ছিল যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। চরম দারিদ্র্যের দিনে অবধূত তাঁর মরুভূমি ভ্রমণের অভিজ্ঞতার পাণ্ডুলিপিটি কবি সুবোধ রায়ের মাধ্যমে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে পৌঁছে দেন। তারাশঙ্কর এর গদ্যশৈলী ও আধ্যাত্মিক গভীরতায় মুগ্ধ হয়ে এটি প্রকাশের জন্য 'মিত্র ও ঘোষ' প্রকাশনীর গজেন্দ্রকুমার মিত্রের কাছে নিয়ে যান। তবে এই 'অদ্ভুত' ও 'বীভৎস রস'-সমৃদ্ধ লেখাটি শুরুতে গজেন্দ্রকুমার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে তারাশঙ্কর এটি নিজের সম্পাদিত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করলে তা গজেন্দ্রকুমারের মায়ের নজরে আসে। তাঁরই তীব্র সুপারিশ ও আদেশে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৪ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পরপরই শুরু হয় অভাবনীয় উন্মাদনা, যা বাংলা প্রকাশনার ইতিহাসে বিরল।

"তৎকালীন সময়ে এই বইটির বাণিজ্যিক সাফল্য ছিল আক্ষরিক অর্থেই অলৌকিক। সকালে বই ছাপা হয়ে দোকানে এলে বিকেলের মধ্যে সব কপি শেষ হয়ে যেত। বাঁধাইকারকরা চাহিদা অনুযায়ী বই জোগান দিতে হিমশিম খেতেন। কথিত আছে, রয়্যালটির টাকা নিতে অবধূতকে প্রতি সপ্তাহে দুটি বড় বড় ব্যাগ নিয়ে আসতে হতো।"

৩. নানী কি হজ: যেখানে মরুভূমির বালিতে মিশেছে ধর্ম ও সম্প্রীতি

বেলুচিস্তানের লাসবেলা জেলায় অবস্থিত এই শক্তিপীঠ সনাতন হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ৫১ পীঠের অন্যতম মহাপীঠ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, এখানে দেবী সতীর 'ব্রহ্মরন্ধ্র' বা মাথার উপরিভাগ পতিত হয়েছিল। অবধূতের বর্ণনায় এই রুক্ষ মরুপথের ভৌগোলিক কঠোরতা ও 'ব্রহ্মক্ষত্রিয়' কিংবদন্তি এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে। পরশুরাম যখন ক্ষত্রিয় নিধনে মত্ত, তখন দেবী হিংলাজ ক্ষত্রিয়দের রক্ষা করতে তাঁদের ব্রাহ্মণের রূপ দান করেছিলেন—এই পৌরাণিক আখ্যানটির সামাজিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

এই তীর্থের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো এর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। স্থানীয় সিন্ধি ও বালুচ মুসলমানরা এই দেবীকে শ্রদ্ধার সাথে 'নানী' বলে সম্বোধন করেন। তাঁদের কাছে এই দুর্গম মন্দিরে আসা কোনো সাধারণ ভ্রমণ নয়, বরং এটি 'নানী কি হজ'। তীর্থযাত্রার অংশ হিসেবে দুর্গম চন্দ্রকূপ নামক কাদা আগ্নেয়গিরিতে নারকেল উৎসর্গ করার যে আদিম ও রহস্যময় আচার, অবধূত তাঁর লেখনীতে তন্ত্র ও বাস্তবতাকে মিলিয়ে তা অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

৪. পাথুরে দেবতার চেয়ে রক্তমাংসের মানুষ সত্য: থিরুমল ও কুন্তীর নিষিদ্ধ প্রেম

'মরুতীর্থ হিংলাজ' গতানুগতিক আধ্যাত্মিকতার গণ্ডি পেরিয়ে রক্তমাংসের মানুষের সম্পর্কের জটিল রসায়ন বিশ্লেষণ করে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় দুই চরিত্র থিরুমল ও কুন্তী (যিনি ১৯৫৯-এর চলচ্চিত্রে 'পদ্মা' নামে পরিচিত) তৎকালীন সমাজ-সংস্কার অগ্রাহ্য করে ঘর ছেড়েছিলেন। তাঁদের এই 'অসামাজিক' প্রেম তৎকালীন রক্ষণশীল বাঙালি পাঠকের মনে প্রবল অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল।

যাত্রাপথের প্রধান দলনেতা বা মহারাজ শুরুতে তাঁদের এই সম্পর্ককে পাপ হিসেবে দেখলেও, মরুভূমির কঠিন লড়াই ও মানুষের চরম বিপন্নতার মাঝে তিনি অনুধাবন করেন যে, মন্দিরের পাথুরে দেবতার চেয়ে রক্তমাংসের মানুষের মানবিকতা ও প্রেম অনেক বেশি সত্য। অবধূতের এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত তাঁর তান্ত্রিক 'দেহ-তত্ত্ব' বা কৌল দর্শনেরই প্রতিফলন, যেখানে মানুষের কাম ও প্রেম কোনোটিই ত্যাজ্য নয়, বরং আধ্যাত্মিক উত্তরণের সোপান।

৫. সেলুলয়েডে মরু-মরীচিকা: বিকাশ রায়ের শৈল্পিক লড়াই ও ল্যান্ডমার্ক সাফল্য

উপন্যাসের অভাবনীয় সাফল্যের পর ১৯৫৯ সালে বিকাশ রায়ের পরিচালনায় এটি চলচ্চিত্রে রূপান্তর করা হয়। তখনকার দিনে আন্তর্জাতিক সীমানার সমস্যার কারণে বেলুচিস্তানে যাওয়া সম্ভব ছিল না, তাই পরিচালক দিঘার সমুদ্র সৈকতকেই মরুভূমি হিসেবে সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করেছিলেন। রাজস্থান থেকে উট নিয়ে আসা হয়েছিল এবং কাস্ট-ক্রুদের খালি পায়ে তপ্ত বালিতে দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে সেই মরুভূমির আবহ তৈরি করা হয়েছিল।

শুটিঙের সময় এক শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনা ঘটেছিল। একটি চরম উত্তেজনার দৃশ্যে উত্তম কুমার যখন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের গলা টিপে ধরেন, তিনি চরিত্রের গভীরে এতটাই ঢুকে গিয়েছিলেন যে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় সত্যিই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে জল দিয়ে তাঁর জ্ঞান ফেরানো হয়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে এবং গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় 'পথের ক্লান্তি ভুলে' গানটি আজও আধ্যাত্মিক বিরহের এক ধ্রুপদী উদাহরণ হয়ে আছে।

চলচ্চিত্রের মূল তথ্য ও বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান:

বিষয়

তথ্য

মুক্তি

১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৯ (মিনার, বিজলী, ছবিঘর)

মূল কলাকুশলী

উত্তম কুমার, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, পাহাড়ী সান্যাল

সঙ্গীত ও আবহ

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (ব্যবহৃত যন্ত্র: ক্লিওলিওন)

বক্স অফিস (প্রথম সপ্তাহান্ত)

১.২ কোটি টাকা (পশ্চিমবঙ্গ)

সামগ্রিক বক্স অফিস সংগ্রহ

৪.৫ কোটি টাকা

সাফল্যের হার

মাত্র ১.৫ মাসের শুটিংয়ে উৎপাদিত হয়ে ৫০% লাভ নিশ্চিত করে

উপসংহার ও ভাবনা

কালিকানন্দ অবধূতের 'মরুতীর্থ হিংলাজ' আমাদের শেখায় যে তন্ত্র কেবল গুহ্য মন্ত্র বা বীভৎস রস নয়, এটি জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে সাহসের সাথে আলিঙ্গন করার এক শক্তি। তাঁর এই আখ্যান বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণ ও দর্শনের এক অভিনব ধারা তৈরি করেছিল, যেখানে ভূগোল ও আধ্যাত্মিকতা একবিন্দুতে এসে মিশেছে। আজ যখন আমরা কৃত্রিম ও যান্ত্রিক জীবনের মরীচিকার পেছনে ছুটি, তখন হিংলাজের সেই রুক্ষ মরু পথ কি আমাদের মনে করিয়ে দেয় না যে—

প্রকৃত মুক্তি কোনো মন্দিরের চার দেয়ালের ভেতরে নয়, বরং নিজের অপরাধবোধ ও কামনার সাথে নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মাঝেই নিহিত? আজকের এই কৃত্রিম পৃথিবীতে হিংলাজের সেই রুক্ষ মরু পথ কি আপনার হৃদয়েও কোনো বিরাগের সুর বাজিয়ে তোলে? কমেন্ট করে আমাদের জানান।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

  গাছতলার মেয়েটি আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও...