বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

বাংলার বিস্মৃত ইতিহাস: মারাঠা 'বর্গি' আক্রমণ


 


বাংলার বিস্মৃত ইতিহাস: মারাঠা 'বর্গি' আক্রমণের ভয়ংকর ও অজানা অধ্যায়

১. ভূমিকা

"খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে?"—শৈশবে শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমাদের কাছে এটি কেবলই একটি ঘুমপাড়ানি গান বা লোর (lullaby), কিন্তু এই সরল ছন্দের আড়ালে চাপা পড়ে আছে আঠারো শতকের বাংলার এক রক্তক্ষয়ী ও বিভীষিকাময় অধ্যায়। মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনী বা 'বর্গি'দের সেই আক্রমণ বাংলার সমাজ ও অর্থনীতিতে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, তা কেবল কোনো সামরিক সংঘাতের গল্প নয়; বরং তা ছিল এক জাতির টিকে থাকার লড়াই। এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের স্বরূপ বুঝতে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই অস্থির সময়ের দিনলিপিতে।

২. ছড়ার আড়ালে লুকানো আর্তনাদ: বাংলার লোর এবং বর্গি ভীতি

বাংলার জনমানসে বর্গি ভীতি এতটাই প্রবল ছিল যে, কয়েকশো বছর পেরিয়েও মায়েরা শিশুদের শান্ত করতে এই ঐতিহাসিক আতঙ্ককে ব্যবহার করেন। ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সালের মধ্যে নাগপুরের মারাঠা শাসক রঘুজী ভোঁসলের বাহিনী বারবার বাংলায় হানা দেয়। ছড়াটিতে যখন বলা হয় "ধান ফুরোলো, পান ফুরোলো, খাজনার উপায় কি?", তখন তা কেবল লৌকিক কাব্য নয়, বরং তৎকালীন লুণ্ঠিত অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের চরম অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। ছড়াটির শেষ পঙক্তি—"আর কটা দিন সবুর করো, রসুন বুনেছি"—এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এখানে 'রসুন বোনা' মূলত বর্গিদের থেকে সময় ভিক্ষা করার এক মরিয়া প্রচেষ্টাকে নির্দেশ করে, যাতে ফসল ফলিয়ে তাদের 'চৌথ' বা খাজনা মেটানো যায়।

৩. ৪ লক্ষ মৃত্যু: ইতিহাসের এক ভয়াবহ গণহত্যা

ইতিহাসবিদ পি. জে. মার্শাল এবং তৎকালীন ডাচ (ওলন্দাজ) সূত্রগুলোর তথ্যানুযায়ী, বর্গি আক্রমণের ফলে সৃষ্ট এই ধ্বংসলীলায় প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। এটি ছিল তৎকালীন বাংলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১.৪ শতাংশ। এই বিশাল প্রাণহানি কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না; বর্গিরা নির্বিচারে সাধারণ কৃষক, ব্যবসায়ী এবং রেশম কারিগরদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছিল। বিশেষ করে বাংলার গর্ব রেশম শিল্প এবং কাপড় বয়ন শিল্প এই আক্রমণে পঙ্গু হয়ে যায়। তৎকালীন কবি গঙ্গারাম তাঁর 'মহারাষ্ট্র পুরাণ'-এ এবং রাজসভার পণ্ডিত বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার তাঁর রচনায় বর্গিদের নিষ্ঠুরতার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা শিউরে ওঠার মতো।

"তারা চিৎকার করে বলত, 'টাকা দাও, টাকা দাও'। টাকা না দিলে তারা নাকে জল ঢুকিয়ে দিত অথবা পুকুরে ডুবিয়ে মারত। টাকা না পেলে পুড়িয়ে মারা হতো... ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব, সন্ন্যাসী কি গৃহস্থ, কেউই রেহাই পায়নি। মানুষের সাথে সাথে তারা গরুও জবাই করত। বড়-ছোট সব বাড়ি, ঘর, মন্দির তারা জ্বালিয়ে দিত।"

৪. কলকাতার 'ডিচার্স' (Ditchers): ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন যখন আজকের রাজপথ

বর্গিরা মূলত নবাব আলীবর্দী খাঁ-র ধীরগতির পদাতিক বাহিনীকে এড়িয়ে দ্রুতগতিতে কেবল লুটপাট চালাত। বর্গিদের এই ক্ষিপ্রতা থেকে বাঁচতে এবং কলকাতার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ১৭৪২ সালে নবাবের অনুমতিক্রমে এক বিশাল পরিখা বা খাল খনন করেন। ৩ মাইল লম্বা এই 'মারাঠা ডিচ' ছিল কলকাতার উত্তর ও পূর্ব সীমানা।

মজার বিষয় হলো, এই খালের ভেতরে অর্থাৎ কলকাতার মূল অংশে বসবাসকারী আদি বাসিন্দাদের ইংরেজিতে 'ডিচার্স' (Ditchers) বলা হতো। ইতিহাসের এই স্মৃতিচিহ্নটি আজ আমাদের প্রতিদিনের ব্যস্ততার নিচে চাপা পড়ে আছে। ১৭৯৯ সালে এই খালের একাংশ বাঁধিয়ে 'আপার সার্কুলার রোড' তৈরি করা হয় এবং পরবর্তীতে ১৮৯৩ সালে এটি সম্পূর্ণ ভরাট করে আজকের 'হ্যারিসন রোড' (বর্তমান মহাত্মা গান্ধী রোড) নির্মাণ করা হয়।

৫. বর্গি-গিরি: গেরিলা যুদ্ধের এক নিষ্ঠুর প্রয়োগ

'বর্গি' শব্দটি এসেছে মারাঠি ও পার্সি শব্দ 'বর্গির' থেকে, যার অর্থ 'হালকা অশ্বারোহী বাহিনী'। এই বাহিনীটি আহমদনগর সুলতানাতের প্রধানমন্ত্রী মালিক অম্বর প্রবর্তিত 'বর্গি-গিরি' বা গেরিলা যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী ছিল। নবাব আলীবর্দী খাঁ সম্মুখ যুদ্ধে মারাঠাদের একাধিকবার পরাজিত করলেও, তাদের ক্ষিপ্রগতির 'হিট অ্যান্ড রান' কৌশলের কাছে তার সেনাবাহিনী অসহায় হয়ে পড়ত। এই কৌশলী যুদ্ধের মাধ্যমেই তারা বাংলার তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদে হানা দিয়ে প্রভাবশালী ব্যাঙ্কার জগৎ শেঠের বাড়ি লুণ্ঠন করতে সক্ষম হয়েছিল।

৬. ধর্মীয় বাইনারির ঊর্ধ্বে: ইতিহাসের এক ভিন্ন দর্পণ

আধুনিক সাম্প্রদায়িক চশমায় ইতিহাসকে 'হিন্দু বনাম মুসলিম' হিসেবে দেখার যে প্রবণতা, বর্গি আক্রমণ তাকে আমূল চ্যালেঞ্জ করে। যখন হিন্দু মারাঠারা বাংলার হিন্দু ও মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালাচ্ছিল, তখন মুসলিম নবাব আলীবর্দী খাঁ তাঁর প্রজাদের রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন।

তবে একজন ঐতিহাসিক বিশ্লেষক হিসেবে আমাদের নিরপেক্ষ থাকতে হবে। সমসাময়িক কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর তাঁর 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যে বর্গিদের শিবের অনুচর এবং এই আক্রমণকে মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু দেব-দেবীর রোষ হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভারতচন্দ্র ছিলেন কৃষ্ণনগরের জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজকবি, যার সঙ্গে খাজনা নিয়ে নবাবের বিবাদ ছিল এবং যাকে নবাব কারারুদ্ধ করেছিলেন। আবার এটাও সত্য যে, আলীবর্দীর সৈন্যরা উড়িষ্যার ভুবনেশ্বরে মন্দির ধ্বংস করার ঘটনায় মারাঠারা ক্ষুব্ধ হয়েছিল। পাশাপাশি নবাবের সেনাবাহিনীর ভেতরে 'মুস্তফা খাঁ'র মতো সেনাপতিদের আফগান বিদ্রোহ মারাঠাদের জয়কে ত্বরান্বিত করেছিল। অর্থাৎ, এই লড়াই ধর্মতাত্ত্বিক নয়, ছিল একান্তই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক।

৭. ময়নগড় দুর্গ: জলের মধ্যিখানে এক দুর্ভেদ্য দ্বীপ

বর্গি আক্রমণের আতঙ্ক থেকে বাঁচতে মেদিনীপুরের জমিদাররা যে অসামান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন ময়নগড় দুর্গ। ব্রিটিশ অফিসার হিউ বলির (H.V. Bayley) ভাষায় এটি ছিল "দ্বীপের ভেতরে দ্বীপ"। এই দুর্গের স্থাপত্যশৈলী ছিল অভূতপূর্ব—দুটি গভীর ও প্রশস্ত পরিখা, যেখানে কুমির ও ঘড়িয়াল ঘুরে বেড়াত। পরিখার ভেতর ছিল টিলার মতো বিশাল মাটির ঢিবি (mounds) এবং বুরুজে সর্বদা সজ্জিত থাকত কামানের সারি। এছাড়া কাঁটাযুক্ত ঘন বাঁশঝাড়ের এমন দেয়াল ছিল যা ভেদ করে অশ্বারোহী বা তিরন্দাজদের প্রবেশ অসম্ভব ছিল। এই দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাই তৎকালীন জমিদারদের খাজনা প্রদান এড়িয়ে বর্গিদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ করে দিত।

৮. উপসংহার

দীর্ঘ এক দশকের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৭৫১ সালে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নবাব উড়িষ্যা প্রদেশটি মারাঠাদের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং বছরে ১২ লক্ষ টাকা 'চৌথ' প্রদানে রাজি হন। এছাড়া বকেয়া চৌথ হিসেবে নবাবকে আরও ৩২ লক্ষ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছিল, যা বাংলার কোষাগারকে শূন্য করে দিয়েছিল।

বর্গি আক্রমণের এই কালো অধ্যায় আজ আমাদের ছড়ায় বন্দি থাকলেও এর শিক্ষা চিরন্তন। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি অনিবার্য। প্রশ্নটি তাই তোলা থাকল: "আমরা কি আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাসের এই ট্র্যাজেডিগুলো থেকে প্রকৃত শিক্ষা নিতে পেরেছি, নাকি আমরা কেবল আমাদের বর্তমানের সংকীর্ণ রাজনৈতিক সুবিধামতো সুবিধাজনক মিথ তৈরি করছি?"

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

  গাছতলার মেয়েটি আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও...