মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

১৯৮৭ সালে মালদহের জগজীবনপুরের 'তুলাভিটা' ঢিবি থেকে প্রাপ্ত তাম্রশাসন

 



মাটির নিচে লুকানো এক বিস্মৃত সাম্রাজ্য: বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ৫টি চমকপ্রদ তথ্য

কল্পনা করুন মালদহের বরেন্দ্র অঞ্চলের সেই লালচে মাটির কথা। আপাতদৃষ্টিতে যা শুধুই এক শান্ত জনপদ, তার কয়েক ফুট নিচেই যে সহস্রাব্দের ইতিহাস নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছে, তা কে জানত? ১৯৮৭ সালের এক সাধারণ দিনে জগজীবনপুর গ্রামের এক কৃষক যখন লাঙল চালাতে গিয়ে একখণ্ড তামা খুঁজে পেলেন, তিনি হয়তো ভেবেছিলেন কোনো মূল্যবান 'গুপ্তধন' পেয়েছেন। কিন্তু সেই তাম্রশাসনটি সোনা বা হীরা জহরাতের চেয়েও অনেক বেশি দামী প্রমাণিত হলো। সেটি ছিল এক বিস্মৃত সাম্রাজ্যের হারানো দলিল। একজন ঐতিহাসিকের চোখে ধুলোবালিমাখা সেই ধ্বংসাবশেষ কোনো রূপকথা নয়, বরং আমাদের শেকড়ের এক জীবন্ত উপাখ্যান। আজ আমরা বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের সেই ৫টি চমকপ্রদ তথ্য জানব, যা আমাদের এই মাটির গভীরের গৌরবময় অতীতকে নতুনভাবে চিনতে সাহায্য করবে।

১. সম্রাট মহেন্দ্রপাল: ইতিহাসের এক 'হারানো' অধ্যায় পুনরুদ্ধার

১৯৮৭ সালে জগজীবনপুরের 'তুলাভিটা' ঢিবি থেকে প্রাপ্ত তাম্রশাসনটি কেবল একটি প্রত্নবস্তু নয়, বরং ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বৈপ্লবিক মোড়। এই আবিষ্কারের আগে ঐতিহাসিকদের মধ্যে এক বিশাল বিভ্রান্তি ছিল। সম্রাট মহেন্দ্রপালকে এতদিন গুর্জর-প্রতিহার বংশের রাজা বলে ভুল করা হতো। কিন্তু এই একটি তাম্রশাসন প্রমাণ করে দিল যে, মহেন্দ্রপাল ছিলেন প্রকৃতপক্ষে পাল রাজবংশের প্রতাপশালী সম্রাট দেবপালের পুত্র এবং প্রকৃত উত্তরাধিকারী।

এই আবিষ্কারের ফলে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন করে লিখতে বাধ্য হয়েছেন গবেষকরা। পাল সাম্রাজ্যের তালিকার এই 'হারানো' রাজাকে পুনরুদ্ধার করা ছিল প্রত্নতত্ত্বের এক বিশাল জয়। একজন প্রকৃত ঐতিহাসিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে কলহন তাঁর 'রাজতরঙ্গিণী'তে লিখেছেন:

“তিনিই প্রকৃত এবং প্রশংসনীয় ঐতিহাসিক, যাঁর অতীত ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা একজন বিচারকের মতোই আবেগ, কুসংস্কার এবং পক্ষপাতহীন।”

জগজীবনপুরের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ইতিহাসের মহাপ্রতাপশালী চরিত্রও কীভাবে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।

২. আস্ত একটি গ্রাম সরিয়ে ইতিহাসের সন্ধান: এক বিরল প্রশাসনিক ত্যাগ

প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ইতিহাসে জগজীবনপুর এক অনন্য ও বিরল নজির স্থাপন করেছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত অমল রায়ের নেতৃত্বে এখানে যে খননকার্য চলে, তার পথ কিন্তু মসৃণ ছিল না। প্রাচীন সেই বৌদ্ধ বিহারের ওপর তখন গড়ে উঠেছিল আধুনিক জনবসতি। মাটির নিচের সেই অমূল্য স্থাপত্য উদ্ধার করতে গিয়ে ঢিবির ওপর বসবাসকারী ২৯টি পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসিত করতে হয়েছিল।

এটি কেবল একটি খননকার্য ছিল না, বরং ছিল "জীবন্ত এবং মৃতের মধ্যেকার এক গভীর টানাপোড়েন"। ঐতিহ্যের খাতিরে একদল মানুষকে তাঁদের ভিটেমাটি থেকে সরিয়ে নেওয়া নৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে এক দুরুহ চ্যালেঞ্জ। আধুনিক উন্নয়নের চেয়েও যে আমাদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেতে পারে, জগজীবনপুর তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

৩. নন্দদীর্ঘি বিহার: বাংলার নিজস্ব বৌদ্ধ স্থাপত্যের শিল্পরূপ

খননকার্যের ফলে বেরিয়ে আসা সেই বিশাল স্থাপত্যটির আসল পরিচয় পাওয়া গেল মাটির নিচে খুঁজে পাওয়া কিছু সীলমোহর থেকে। জানা গেল, নবম শতাব্দীর এই বিহারটির নাম ছিল 'নন্দদীর্ঘি বিহার'। এটি কেবল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আবাসস্থল ছিল না, বরং উত্তরবঙ্গের জ্ঞানচর্চার এক প্রাণকেন্দ্র ছিল।

নন্দদীর্ঘি বিহারের স্থাপত্যে আমরা পাল আমলের নিজস্ব শৈলীর প্রতিফলন দেখতে পাই। এখানে পাওয়া গেছে:

  • কেন্দ্রীয় উপাসনালয় (Sanctum) এবং তার চারপাশের প্রদক্ষিণ পথ।
  • বৌদ্ধ ভিক্ষুদের থাকার জন্য সুপরিকল্পিত কক্ষ ও উন্মুক্ত আঙিনা।
  • একটি ব্রোঞ্জ নির্মিত বুদ্ধমূর্তি, যার প্রভামণ্ডলের (Halo) পেছনে খোদাই করা ছিল বিশেষ 'বৌদ্ধ ধর্মসূত্র' (Buddhist creed)।
  • বৌদ্ধ দেবী 'মারীচী'র একটি অত্যন্ত দুর্লভ ধাতুনির্মিত মূর্তি।

নালন্দা বা বিক্রমশিলার মতো বিশাল না হলেও, নন্দদীর্ঘি বিহার নবম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্মের এক প্রস্ফুটিত কেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল।

৪. পোড়ামাটির ফলক: যখন মাটি কথা বলে

জগজীবনপুরের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এখানকার স্তূপীকৃত ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার হওয়া অগণিত পোড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটা। এই ফলকগুলোতে পাল আমলের শিল্পকলা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। আগের আমলের সমতল বা দ্বিমাত্রিক ফলকের বদলে এখানে দেখা যায় চমৎকার 'ত্রিমাত্রিক' (Three-dimensional) কারুকাজ।

শিল্প ইতিহাসবিদদের মতে, এই ত্রিমাত্রিক শৈলীটি পাল আমলের শিল্পকলার পূর্ণতা বা 'ম্যাচুরেশন' প্রকাশ করে। এই ফলকগুলোতে কেবল যোদ্ধা বা সরীসৃপ নয়, বরং ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেই সময়ের মানুষের বীরত্ব, দেব-দেবী এবং দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। পশ্চিমবঙ্গের আর কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক স্থলে এত বিপুল পরিমাণে এমন উন্নতমানের টেরাকোটা স্থাপত্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। এগুলো কেবল শিল্প নয়, তৎকালীন সামাজিক ইতিহাসের এক অমূল্য প্রাথমিক উৎস।

৫. জল ও জঙ্গলের গ্রাসে ইতিহাস: প্রকৃতি বনাম প্রত্নতত্ত্ব

বাংলার বদ্বীপ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি যেমন রহস্যময়, তেমনি অবাধ্য। এখানকার নদীগুলো 'পরিবর্তনশীল' বা ফ্লুভিয়াল (Fluvial)— যা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের জন্য একইসাথে আশীর্বাদ ও অভিশাপ। শক্তিশালী গঙ্গা বা তার শাখা নদীগুলো বারবার তাদের গতিপথ বদলেছে, আর সেই স্রোতের তোড়ে অনেক প্রাচীন জনপদ মাটির নিচে চাপা পড়েছে বা শারীরিকভাবে ধসে গেছে।

বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ডি.আর. পাটিল ১৯৬৩ সালেই এই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, অরণ্যের শিকড় আর নদীর জল অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যকে ইতিমধ্যেই গ্রাস করেছে। বাংলার এই "জলজ ভূমি" (Waterborne land) একদিকে যেমন পলি মাটির চাদরে ইতিহাসকে রক্ষা করে, তেমনি নদীর ভাঙন আর প্রাকৃতিক শক্তি তা চিরতরে মুছেও দেয়। শিল্পায়ন আর আধুনিক নির্মাণের ভিড়ে অবশিষ্ট নিদর্শনগুলোকে রক্ষা করা এখন এক চরম জরুরি কর্তব্যে পরিণত হয়েছে।

উপসংহার: আগামীর জন্য কী টিকে থাকবে?

পাল সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে বাংলার বৌদ্ধ ধর্মেও বিবর্তন ঘটেছিল। প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্ম থেকে তন্ত্রনির্ভর বজ্রযান ও সহজযান মতবাদের দিকে এক দীর্ঘ রূপান্তর ঘটেছিল এই জনপদে। সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে সেই পবিত্র স্থাপত্যগুলো একসময় প্রকৃতির দখলে চলে যায়।

আজ আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই 'নীরব ও পবিত্র স্থাপত্য'গুলোকে কি আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করতে পারব? নদী আর আধুনিক উন্নয়নের থাবা থেকে এই সম্পদগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা কেবল প্রত্নতাত্ত্বিকদের দায় নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত জাতীয় দায়িত্ব। অরণ্য বা আধুনিক দালানকোঠা গ্রাস করার আগেই আমাদের উচিত নিজেদের শেকড়কে চেনা এবং এই নিঃশব্দ ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। নাহলে হয়তো আগামীর কোনো এক প্রজন্ম আমাদের পায়ের নিচে চাপা পড়া এই গৌরবকে আর কোনোদিন খুঁজে পাবে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

  গাছতলার মেয়েটি আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও...