সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ড — ডালাস, ১৯৬৩




 জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ড — ডালাস, ১৯৬৩

হত্যার পটভূমি ও পূর্ববর্তী প্রসঙ্গ কেনেডি ১৯৬১ সালে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম রাষ্ট্রপতি হন — আমেরিকার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তাঁর সময়কাল ছিল শীতল যুদ্ধের তুঙ্গমুহূর্ত — কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস, বার্লিন প্রাচীর, ভিয়েতনাম প্রশ্ন এবং সিভিল রাইটস আন্দোলন একসাথে চলছিল। ১৯৬৩ সালের নভেম্বরে তাঁর টেক্সাস সফরের মূল লক্ষ্য ছিল ১৯৬৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট দলের দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ মেটানো। গভর্নর জন কনালি ও সিনেটর র‍্যালফ ইয়ারবোরোর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব চলছিল। হত্যাকারী — লি হার্ভে অসওয়াল্ড অসওয়াল্ড প্রাক্তন মার্কিন মেরিন সেনা ছিলেন। তিনি ১৯৫৯ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব ছেড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে চলে যান এবং ১৯৬২ সালে ফিরে আসেন। তিনি মার্ক্সবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন এবং "ফেয়ার প্লে ফর কিউবা" নামক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। হত্যার কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি টেক্সাস স্কুল বুক ডিপোজিটরিতে চাকরি নেন — যে ভবনটি মোটরকেডের রুটের পাশেই অবস্থিত ছিল। হত্যার দিন — ২২ নভেম্বর ১৯৬৩ সেদিন ডালাসের আবহাওয়া অপ্রত্যাশিতভাবে পরিষ্কার ছিল, তাই গাড়ির বুলেটপ্রুফ বাবল-টপ সরিয়ে খোলা লিমুজিনে শহর প্রদক্ষিণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জ্যাকি কেনেডি গোলাপি শ্যানেল স্যুট পরে পাশে বসেছিলেন। ডিলি প্লাজায় ঘড়িতে তখন ঠিক ১২টা বেজে ৩০ মিনিট। ছয় সেকেন্ডের মধ্যে কমপক্ষে তিনটি গুলি ছোড়া হয়। প্রথম গুলি ঘাড়ে বিদ্ধ হয়, শেষ গুলিটি মাথায় লেগে মারাত্মক আঘাত করে। জ্যাকি কেনেডি বিভ্রান্ত হয়ে গাড়ির পেছনে উঠে পড়েন। সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট ক্লিন্ট হিল তাঁকে ধরে ফিরিয়ে আনেন। গুলির আওয়াজের প্রায় সাথে সাথে পুলিশ টেক্সাস স্কুল বুক ডিপোজিটরি ভবন ঘেরাও করে। ছয় তলায় পাওয়া যায় ইতালীয় ম্যানলিশার-কারকানো রাইফেল এবং তিনটি কার্তুজ। কেনেডিকে পার্কল্যান্ড মেমোরিয়াল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু দুপুর ১টায় তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। "ম্যাজিক বুলেট" তত্ত্ব — সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্ন ওয়ারেন কমিশনের তদন্তে দাবি করা হয় যে একটি মাত্র বুলেট কেনেডির ঘাড় ভেদ করে গভর্নর কনালির বুক, কব্জি ও উরুতে আঘাত করে — মোট সাতটি আঘাত একটি বুলেটে। সমালোচকরা এটিকে "ম্যাজিক বুলেট" বলে উপহাস করেন এবং দ্বিতীয় বন্দুকধারীর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে মনে করেন। হত্যার পরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা অসওয়াল্ডকে গ্রেফতারের মাত্র দুই দিন পর, ২৪ নভেম্বর, ডালাসের নাইটক্লাব মালিক জ্যাক রুবি পুলিশ স্টেশনে প্রবেশ করে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে অসওয়াল্ডকে গুলি করে হত্যা করেন। এটি ছিল আমেরিকার টিভি ইতিহাসের প্রথম লাইভ হত্যাকাণ্ড। রুবির এই কাজ অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয় — সত্য কি চিরতরে চাপা পড়ে গেল? ১৯৬৪ সালে প্রধান বিচারপতি আর্ল ওয়ারেনের নেতৃত্বে গঠিত ওয়ারেন কমিশন ১০ মাস তদন্ত করে সিদ্ধান্ত দেয় — অসওয়াল্ড একাই হত্যাকারী, কোনো ষড়যন্ত্র নেই। কিন্তু ১৯৭৯ সালে মার্কিন কংগ্রেসের হাউস সিলেক্ট কমিটি ভিন্ন মত দেয় — "সম্ভবত ষড়যন্ত্র ছিল।" হত্যার পরের দৃশ্যটিও ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। জ্যাকি কেনেডি রক্তমাখা গোলাপি পোশাকেই এয়ার ফোর্স ওয়ানে দাঁড়িয়ে থাকেন যখন লিন্ডন বি জনসন শপথ নেন। তিনি পোশাক পাল্টাতে অস্বীকার করেন বলে জানান — "তারা দেখুক কী করেছে।" ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও অপ্রকাশিত নথি দশকের পর দশক ধরে প্রধান তিনটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব টিকে আছে। CIA তত্ত্ব অনুযায়ী, কেনেডি ভিয়েতনাম থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছিলেন এবং CIA-বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন — তাই গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোষ্ঠী তাঁকে হত্যা করে। মাফিয়া তত্ত্ব বলে, কেনেডি প্রশাসনের অর্গানাইজড ক্রাইম-বিরোধী অভিযানের প্রতিশোধ নিয়েছিল সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র। কিউবা সংযোগ তত্ত্ব অনুযায়ী, বে অব পিগস আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার প্রতিশোধে কিউবান বা কিউবা-বিরোধী শক্তি এর পেছনে ছিল। ২০১৭ সাল থেকে মার্কিন সরকার হাজার হাজার গোপন নথি প্রকাশ করতে শুরু করেছে, যদিও এখনও কিছু অংশ গোপন রাখা হয়েছে — যা নতুন করে সন্দেহের জন্ম দেয়। ঐতিহাসিক প্রভাব কেনেডির মৃত্যু আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রতি আমেরিকানদের ঝোঁক বহুলাংশে এই হত্যার অনিষ্পন্ন রহস্য থেকে জন্ম নিয়েছে। ওয়ারেন রিপোর্টের প্রতি আস্থাহীনতা সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর সাধারণ মানুষের সন্দেহের শুরু হিসেবেও চিহ্নিত। এবং সেই রক্তমাখা গোলাপি পোশাক — যা জ্যাকি কেনেডি ইচ্ছাকৃতভাবে ধুতে দেননি — আজও ডালাস মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

  গাছতলার মেয়েটি আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও...