মায়ং: ভারতের 'ব্ল্যাক ম্যাজিক' রাজধানী ও তার রহস্যময় জাদুঘরের অন্দরমহল
১. ভূমিকা: যেখানে বিজ্ঞানের সীমানা শেষ এবং রহস্যের শুরু আসামের গুয়াহাটি শহর থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে ব্রহ্মপুত্রের পলিমাখা বুক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এক নিভৃত জনপদ—মায়ং। মরিগাঁও জেলার এই শান্ত গ্রামটিকে বিশ্বজুড়ে মানুষ চেনে ‘ভারতের হগওয়ার্টস’ নামে। এখানে পা রাখলে মনে হয় সময় থমকে গেছে কোনো এক মায়াবী কুয়াশার চাদরে। আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ যেখানে তাদের সীমানা শেষ করে, মায়ং-এর অলৌকিক লোকগাথা সেখান থেকেই প্রাণ পায়। এটি এমন এক স্থান যেখানে অতিপ্রাকৃত ও বাস্তব সমান্তরালে চলে, আর সেই রহস্যময় জগতের অন্দরমহলে উঁকি দিতেই আজ আমাদের এই যাত্রা।
২. মহাভারত থেকে মুঘল ইতিহাস: মায়ং-এর শেকড় যেখানে প্রোথিত মায়ং নামের ব্যুৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। কেউ বলেন এটি সংস্কৃত ‘মায়া’ (বিভ্রম) শব্দ থেকে উদ্ভূত। আবার নৃতাত্ত্বিক তত্ত্বে মনে করা হয়, ডিমাসা ভাষার ‘মিয়ং’ (হাতি) বা মণিপুরি ‘মৈরাং’ বংশের নাম থেকে এই জনপদের নামকরণ হয়েছে। পৌরাণিক ইতিহাসে মায়ং-এর উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতের পাতায়; লোকবিশ্বাস মতে, ভীম ও হিড়িম্বার পুত্র ঘটোৎকচ এখান থেকেই তাঁর জাদুকরী যুদ্ধের কৌশল শিখেছিলেন।
মুঘল যুগেও মায়ং ছিল এক ত্রাসের নাম। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনকালের রাজকীয় ইতিবৃত্ত ‘আলমগির নামা’-তে মায়ং-এর জাদুবিদ্যার ভয়ানক প্রভাবের বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে মায়ং-এর সবচেয়ে আলোচিত ঐতিহাসিক জনশ্রুতি হলো মুঘল সেনাবাহিনীর রহস্যজনক অন্তর্ধান।
“প্রচলিত বিশ্বাস ও লোকগাথা অনুসারে, সম্রাট মুহাম্মদ শাহের শাসনামলে তাঁর ১ লক্ষ অশ্বারোহী সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী মায়ং-এর গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু অলৌকিক কোনো মায়ায় সেই বাহিনীর একজন সৈন্যও আর ফিরে আসেনি; তারা কোনো চিহ্ন না রেখেই ঘন জঙ্গলে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। যদিও আধুনিক ইতিহাসে এর কোনো অকাট্য দালিলিক প্রমাণ নেই, তবুও মায়ং-এর ‘মায়া’ বা বিভ্রমের শক্তি হিসেবে এই কাহিনীটি আজও মুখে মুখে ফেরে।”
৩. 'বেজ' বা ওঝা: প্রাচীন চিকিৎসার অনন্য জাদুকরী পদ্ধতি মায়ং-এর প্রতিটি গলিতে আজও বাস করেন প্রায় ১২০ জন ‘বেজ’ বা ওঝা। তারা বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত গোপন মন্ত্র ও ভেষজ বিদ্যার অধিকারী। তবে তাদের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক পদ্ধতি হলো ‘তামার থালা’ বা স্থানীয় ভাষায় ‘কাঁহোর থালি’র সাহায্যে ব্যথানাশক চিকিৎসা। পিঠের বা হাড়ের ব্যথা নিরাময়ে মন্ত্রপূত একটি তামার থালা রোগীর ব্যথার স্থানে স্পর্শ করালে সেটি চুম্বকের মতো আটকে যায়।
গবেষক হিসেবে আমি লক্ষ্য করেছি, এই পদ্ধতির একটি শিহরণ জাগানিয়া দিক রয়েছে। সোর্স অনুযায়ী, যদি রোগীর ব্যথা অত্যন্ত তীব্র হয়, তবে মন্ত্রের প্রভাবে সেই তামার থালাটি আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং একসময় আপনাআপনি সশব্দে ভেঙে যায়। এছাড়া মায়ং-এর বাসিন্দারা কড়ি (Seashells) এবং ভাঙা কাঁচের টুকরো ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে ভাগ্য গণনা বা ভবিষ্যৎবাণী করার প্রথাও ধরে রেখেছেন।
৪. মায়ং সেন্ট্রাল মিউজিয়াম: যেখানে ধুলোবালিমাখা পাণ্ডুলিপিতে লুকিয়ে আছে প্রাচীন মন্ত্র ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘মায়ং সেন্ট্রাল মিউজিয়াম অ্যান্ড এম্পোরিয়াম’ কেবল একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়, এটি প্রাচীন তান্ত্রিক সংস্কৃতির এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। এখানকার ধুলোমাখা শেলফগুলোতে সংরক্ষিত আছে শত বছরের পুরনো তালপাতার পাণ্ডুলিপি, যা মূলত ‘ব্রজবালী’ ও ‘কাইথেলি’ লিপিতে লেখা। এই লিপিগুলো আসামের ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।
জাদুঘরের পাণ্ডুলিপিগুলোতে নির্দিষ্ট রোগের মন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন— ‘সন্নিপাত জ্বর’ নিরাময়, ‘সর্প মণিরাজ’ (সাপের কামড়ের মন্ত্র), কিংবা গবাদি পশুর চিকিৎসার জন্য ‘গোকরতি মন্ত্র’। এছাড়া এখানে প্রদর্শিত ‘দাখোর’ বা নরবলিতে ব্যবহৃত বিশাল তরবারি এবং হাড় দিয়ে তৈরি কবচ পর্যটকদের মনে ভীতিমিশ্রিত বিস্ময় জাগায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘বাঘ বান্ধা মন্ত্র’ সম্বলিত পাণ্ডুলিপি, যার সাহায্যে বন্য বাঘকে বশ করা হতো বলে দাবি করা হয়।
৫. অবিশ্বাস্য অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা: লোকগাথার সেই শিহরণ জাগানিয়া গল্প মায়ং-এর অতিপ্রাকৃত গল্পের ভাণ্ডার অশেষ। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘উড়ান মন্ত্র’। সাধারণ মানুষের ধারণা এটি ডানা মেলে ওড়া, কিন্তু স্থানীয়দের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই মন্ত্র প্রয়োগ করলে একজন মানুষ মুহূর্তের মধ্যে ১০ কদম এগিয়ে যায়—পিছন থেকে কেউ তাকে ধরতে চাইলেও ছোঁয়া যায় না। এছাড়া ‘মোহিনী মন্ত্র’ বা বশীকরণ বিদ্যা এবং মানুষকে পশুপাখিতে রূপান্তরের গল্পগুলো এই অঞ্চলের লোকজ বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উল্লেখ্য যে, আসামের ইতিহাসে ‘ডাইনী শিকার’ (Witch-hunting)-এর মতো একটি অন্ধকার অধ্যায়ও জড়িয়ে আছে। তবে ২০১৫ সালের কঠোর আইন এবং স্থানীয় সচেতনতায় মায়ং আজ কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে এসে তার এই প্রাচীন জ্ঞানকে ‘সাদা জাদু’ বা জনকল্যাণমূলক নিরাময় বিদ্যায় রূপান্তর করেছে।
৬. মায়ং ও পবিত্রা: জাদু এবং বন্যপ্রাণের এক অপূর্ব মেলবন্ধন মায়ং ভ্রমণে আসা পর্যটকদের জন্য বাড়তি পাওনা হলো এর লাগোয়া ‘পবিত্রা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনত্বের একশৃঙ্গ গণ্ডারের আবাস। ব্রহ্মপুত্রের শান্ত জলরাশি আর পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ‘নরসিংহ মন্দির’ থেকে সূর্যাস্ত দেখা এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা। পর্যটকদের জন্য নভেম্বর মাসে আয়োজিত ‘মায়ং পবিত্রা উৎসব’ হলো শ্রেষ্ঠ সময়। এছাড়া এখানে ‘নৌকা খণ্ড উৎসব’ এবং ‘শীতলা পূজা’-র মতো অনুষ্ঠানগুলোতে মায়ং-এর প্রকৃত সাংস্কৃতিক বর্ণিলতা ফুটে ওঠে।
৭. উপসংহার: রহস্য ও বাস্তবতার এক চিরন্তন সন্ধি মায়ং-এর এই প্রাচীন তান্ত্রিক ঐতিহ্য বর্তমানে এক ‘বিলুপ্তপ্রায় শিল্প’ (Dying Art) হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক যুগের ছোঁয়ায় অনেক গোপন মন্ত্র ও পাণ্ডুলিপি অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে। মায়ং আমাদের শেখায় যে, পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু আছে যা কেবল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। এটি রহস্য ও বাস্তবতার এক চিরন্তন সন্ধিস্থল।
পরিশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—মায়ং-এর এই জাদু কি কেবল চোখের ভুল বা নিছক বিভ্রম, নাকি এমন কোনো শক্তি যা আমাদের চেনা বিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরে? হয়তো এর উত্তর লুকিয়ে আছে মায়ং-এর সেই নীরব পাণ্ডুলিপিগুলোর ভাঁজে, যা আজও আমাদের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.