মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

‘স্থাপত্য বিদ্রোহের’ সাক্ষী বসু বাটির ৫টি অজানা কাহিনী

 



বিস্মৃতির অন্তরালে উত্তর কলকাতার আভিজাত্য: ‘স্থাপত্য বিদ্রোহের’ সাক্ষী বসু বাটির ৫টি অজানা কাহিনী

উত্তর কলকাতার সরু গলিগুলোতে পা রাখলে আজও মনে হয় সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যে ‘বাবু কালচার’ এবং ‘সিটি অফ প্যালেসেস’-এর জৌলুস ছড়িয়ে পড়েছিল, তার অনেক নিদর্শনই আজ জীর্ণ দেওয়াল আর খসে পড়া পলেস্তারার নিচে ধুঁকছে। আমাদের চোখের সামনেই এক বিশাল ইতিহাস প্রতিদিন ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। বাগবাজার স্ট্রিটের এমনই এক অনন্য ও রহস্যময় স্থাপত্য হলো ‘বসু বাটি’। ১৮৫০-এর দশকের ইউরোপীয় অনুকরণে তৈরি প্রাসাদগুলোর ভিড়ে এটি এক ব্যতিক্রমী নিদর্শন, কারণ এর পরতে পরতে মিশে আছে জাতীয়তাবোধ এবং ব্রিটিশ বিরোধী এক নীরব প্রতিবাদ।

বসু বাটির ইতিহাসের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা ৫টি বিস্ময়কর দিক নিয়ে একজন ঐতিহাসিক স্থাপত্য বিশারদের কলমে আজকের এই প্রতিবেদন।

১. স্থাপত্য যখন প্রতিবাদের ভাষা: নীলমণি মিত্রের ‘স্থাপত্য বিদ্রোহ’

বসু বাটির নির্মাণশৈলী উত্তর কলকাতার অন্য যেকোনো জমিদার বাড়ির চেয়ে আলাদা। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৮৭৬ সালের অক্টোবরে এবং পরিবারটি এখানে বসবাস শুরু করে ১৮৭৮ সালে। যখন সমসাময়িক ধনাঢ্য বাঙালিরা ব্রিটিশদের তুষ্ট করতে ইউরোপীয় ‘নিও-ক্লাসিক্যাল’ বা ‘কোরিন্থিয়ান’ শৈলীতে বাড়ি বানাচ্ছিলেন, তখন বসু পরিবার বেছে নিয়েছিলেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ।

এই প্রাসাদের স্থপতি ছিলেন নীলমণি মিত্র, যিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি কোয়ালিফাইড সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি ব্রিটিশদের অন্ধ অনুকরণ না করে এই প্রাসাদে হিন্দু ও ইসলামি স্থাপত্যের এক অনন্য মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। একে এক প্রকার ‘স্থাপত্য বিদ্রোহ’ বলা যেতে পারে।

  • লায়ন ক্যাপিটাল ও বিডেড স্টাকো: বাড়ির দক্ষিণের থামগুলোর মাথায় সাধারণ ইউরোপীয় ফুল-লতার বদলে রয়েছে বৃত্তাকার সিংহমূর্তি বা ‘লায়ন ক্যাপিটাল’। বিশেষজ্ঞের চোখে দেখলে ধরা পড়বে, এই সিংহমূর্তিগুলো একে অপরের সাথে ‘ডাবল রো অফ বিডস’ বা দু-সারি পুঁতির কারুকার্য (stucco beads) দিয়ে যুক্ত।
  • ইসলামি খিলান ও মন্দির স্থাপত্য: বাড়ির নিচতলায় রয়েছে ইসলামি রীতির খাঁজকাটা খিলান (Scalloped Arches)। আবার ঠাকুর দালানের ভেতরের স্তম্ভগুলো দেখতে অনেকটা মধ্যযুগীয় হিন্দু মন্দিরের স্তম্ভের মতো—বেঁটে ও মজবুত, যার উপরিভাগে রয়েছে পদ্মকোরকের মোটিফ।

২. ইতিহাসের সাক্ষী: ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ ও রাখি বন্ধন

বসু বাটির ঠাকুর দালান কেবল ধর্মীয় উৎসবের জায়গা ছিল না, এটি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ১৯০৫ সালে যখন লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করেন, তখন এই বাড়িটি প্রতিবাদের মূল মঞ্চ হয়ে ওঠে।

“এই ঠাকুর দালানে একসময় ২৪ ফুট উঁচু দেওয়ালে সোনার সিলিং আর বিশালাকার ঝাড়লণ্ঠনের জৌলুস ছিল। এটি কেবল একটি উপাসনালয় ছিল না, ছিল আলোর ঝরনাধারা আর উদযাপনের প্রাণকেন্দ্র... যা আজ পায়রাদের আস্তানায় পরিণত হয়ে এক অন্ধকার, গুমোট গহ্বরে রূপ নিয়েছে।” — জোয়ান টেলর (স্থাপত্য গবেষক)

  • রাখি বন্ধন ও স্বদেশী আন্দোলন: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে এক বিশাল মিছিল ফেডারেশন হল থেকে শুরু হয়ে বসু বাটিতে এসে শেষ হয়। এখানেই হিন্দু ও মুসলিমরা একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে ঐক্যের শপথ নিয়েছিলেন।
  • জাতীয় তহবিল: এই বাড়ির ঠাকুর দালানেই সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্বদেশী আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন এবং ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের সংকল্প নেওয়া হয়েছিল। সেদিনই দেশীয় শিল্পের জন্য ‘ন্যাশনাল ফান্ড’-এ প্রায় ৫০,০০০ টাকা সংগৃহীত হয়েছিল। ১৯০৬ সালে বাংলার প্রথম 'খাদি প্রদর্শনী'ও এই বসু বাটির প্রাঙ্গণেই অনুষ্ঠিত হয়।

৩. আভিজাত্য ও অদ্ভুত বিলাসিতা: বসু পরিবারের বংশলতিকা

বসু বাটির দুই কৃতি সন্তান নন্দলাল বসুপশুপতিনাথ বসু ছিলেন দশরথ বসুর ২৪তম বংশধর। এই পরিবারের বংশলতিকা অত্যন্ত প্রাচীন এবং প্রভাবশালী।

  • বিখ্যাত উত্তরসূরি: এই পরিবারের মূল শাখার উত্তরসূরিদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের প্রবাদপ্রতিম নেতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং বিশ্ববিখ্যাত ‘বসু অডিও’ (Bose Audio)-র প্রতিষ্ঠাতা অমর গোপাল বসু
  • ১১২ পদের রাজকীয় ভোজ: জমিদার অনাথনাথ বসু (যিনি বাগবাজারে ‘কালিবাবু’ নামে পরিচিত ছিলেন) তার বিলাসিতার জন্য আজও কিংবদন্তি হয়ে আছেন। শোনা যায়, তার ভাগ্নীর আশীর্বাদের অনুষ্ঠানে ১১২ পদের এক অভাবনীয় ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানের মেনু কার্ডটি ছাপা হয়েছিল সিল্কের রুমালে, যা অতিথিদের উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। এই আভিজাত্য কেবল বিলাসিতা ছিল না, বরং ব্রিটিশদের চোখে আঙুল দিয়ে বাঙালির অর্থনৈতিক সক্ষমতা দেখানোর একটি মাধ্যম ছিল।

৪. শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতা ও নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্‌-এর সফর

বসু পরিবার ছিল শিল্প ও সংস্কৃতির একনিষ্ঠ অনুরাগী। তাদের সংগ্রহে থাকা কালীঘাট পট চিত্র এবং ‘তাঞ্জোর পেন্টিং’ দেখে প্রখ্যাত শিল্পী যামিনী রায়ও অনুপ্রাণিত হতেন।

  • বামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিত্রাবলী: ঠাকুর দালানের দেওয়াল অলঙ্কৃত করেছিল শিল্পী বামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন পৌরাণিক দৃশ্য। এই ছবিগুলো আজও বাঙালির শিল্পচেতনার স্বাক্ষর বহন করে।
  • অযোধ্যার নবাবের উপস্থিতি: এক সময় যখন অযোধ্যার নির্বাসিত নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্‌ কলকাতায় ছিলেন, তিনি গিরিশ ঘোষের ‘পাণ্ডব গৌরব’ নাটকটি দেখতে বসু বাটিতে এসেছিলেন। নবাব খুব কম মানুষের বাড়িতেই যেতেন, তাই তার এই সফর বসু বাটির সামাজিক মর্যাদাকে শিখরে নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নন্দলাল বসুর আমন্ত্রণে এই বাড়িতে পদধূলি দিয়েছিলেন।

৫. বর্তমানের করুণ দশা ও ‘হেরিটেজ লক’

এত ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আজ বসু বাটির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ১৯৫৬ সালে আইনি জটিলতা ও ঋণের দায়ে বাড়িটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। পূর্ব অংশটি বর্তমানে সরকারি লাইব্রেরি (Ramakrishna Day Students Home) হলেও পশ্চিম অংশটি এক বেসরকারি সংস্থার অধীনে রয়েছে।

  • টেকনিক্যাল জটিলতা: বাড়িটি ‘গ্রেড-১ হেরিটেজ’ মর্যাদা পাওয়ায় এর সংস্কারে এক অদ্ভুত আইনি অচলাবস্থা বা ‘হেরিটেজ লক’ তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেখলে, ১৯ শতকের এই ভবনের ছিদ্রযুক্ত পুরনো ইটের (porous bricks) সাথে আধুনিক পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট একদমই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সিমেন্ট ব্যবহারের ফলে ইটের ভেতরে জলীয় বাষ্প আটকে যায়, যা নোনা বাড়িয়ে দেওয়ালকে দ্রুত নষ্ট করে দেয়। এর সংস্কারের জন্য প্রয়োজন চুন-সুরকি (lime and surki) এবং রাজস্থানের দক্ষ কারিগর, যা বর্তমানে অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ ও দুর্লভ।

উপসংহার

বসু বাটি কেবল ইট-পাথরের কোনো অট্টালিকা নয়, এটি বাঙালির রেনেসাঁ, বিপ্লব আর হারিয়ে যাওয়া আভিজাত্যের এক জীবন্ত মহাফেজখানা। উত্তর কলকাতার এই অনন্য ঐতিহ্য কি শেষ পর্যন্ত স্রেফ ধুলোয় মিশে যাবে, নাকি আমাদের সচেতনতা একে নতুন প্রাণ দেবে? বর্তমানে সেই আলো ঝলমলে ঠাকুর দালানটি পায়রাদের আস্তানায় পরিণত হলেও, তার দেওয়ালগুলো আজও সুরেন্দ্রনাথের ভাষণ আর রবি ঠাকুরের রাখিবন্ধনের স্পন্দন ধরে রেখেছে। এই শিকড়কে রক্ষা করা আজ আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

  গাছতলার মেয়েটি আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও...