রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

সময় ভ্রমণ কি আসলেই সম্ভব?

 



সময় ভ্রমণ কি আসলেই সম্ভব? বিজ্ঞানের পাতা থেকে ৫টি বিস্ময়কর ও অনুপ্রেরণামূলক তথ্য

১৯৫৫ সালের মে মাস। নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসে মাত্র ১০ বছরের এক কিশোর তার বাবাকে হারায়। বাবার এই আকস্মিক মৃত্যু কিশোরটির জগতকে ওলটপালট করে দিয়েছিল। এক অদ্ভুত কাকতালীয় ব্যাপার হলো, তার বাবার মৃত্যুর ঠিক এক মাস আগে, ১৯৫৫ সালের এপ্রিলেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন সর্বকালের সেরা পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। শোকাতুর সেই কিশোরের হাতে একদিন আসে এইচ. জি. ওয়েলসের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য টাইম মেশিন’। সেখানে তিনি একটি অসাধারণ পঙ্ক্তি খুঁজে পান— "বিজ্ঞানমনস্ক মানুষেরা ভালো করেই জানেন যে সময় আসলে এক ধরনের স্থান বা স্পেস এবং আমরা সময়ের ভেতরে ঠিক সেভাবেই সামনে-পেছনে যাতায়াত করতে পারি, যেভাবে আমরা স্থানের মধ্যে চলাফেরা করি।"

সেই কিশোরটি ছিলেন বর্তমানের প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ডঃ রোনাল্ড ম্যালেট। সেদিন থেকেই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় একটি টাইম মেশিন তৈরি করা, যাতে তিনি অতীতে ফিরে গিয়ে তার বাবাকে আসন্ন হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে সতর্ক করতে পারেন। সময় ভ্রমণ কি কেবলই কল্পবিজ্ঞানের আখ্যান, নাকি মহাবিশ্বের নিয়মের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর চাবিকাঠি? চলুন বিজ্ঞানের দর্পণে দেখে নেওয়া যাক সময় ভ্রমণ নিয়ে ৫টি বিস্ময়কর তথ্য।

১. ভবিষ্যতে ভ্রমণ কোনো গল্প নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক সত্য

আমরা সিনেমায় দেখি মানুষ চোখের পলকে কয়েক শতাব্দী পরের পৃথিবীতে চলে যাচ্ছে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি কেবল সম্ভবই নয়, বরং এটি একটি প্রমাণিত ধ্রুব সত্য। আইনস্টাইনের 'স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটি' অনুযায়ী, কোনো বস্তু যত দ্রুত গতিতে চলে, তার জন্য সময় তত ধীর হয়ে যায়। একে বলা হয় 'টাইম ডাইলেশন' (Time Dilation)।

এর বাস্তব প্রমাণ আমাদের মাথার ওপরেই জিপিএস (GPS) স্যাটেলাইটের মধ্যে বিদ্যমান। প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীর চারদিকে ঘোরার কারণে এবং তুলনামূলক কম মহাকর্ষের প্রভাবে স্যাটেলাইটের ঘড়িগুলো পৃথিবীর ঘড়ির তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৩৮ মাইক্রোসেকেন্ড দ্রুত চলে। যদিও এটি সামান্য, কিন্তু এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি গণনায় না নিলে আমাদের জিপিএস ব্যবস্থা ভুল দিকনির্দেশনা দিত। আবার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) থাকা মহাকাশচারীরা যখন পৃথিবীতে ফিরে আসেন, তারা টেকনিক্যালি পৃথিবীর সময়ের চেয়ে কয়েক মিলিসেকেন্ড ভবিষ্যতে পা রাখেন। অর্থাৎ, আপনি যদি আলোর গতির কাছাকাছি কোনো মহাকাশযানে চড়ে মহাকাশে ঘুরে আসেন, তবে পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখবেন আপনার সমবয়সীরা বুড়ো হয়ে গেছে, অথচ আপনার বয়স প্রায় আগের মতোই আছে।

"আইনস্টাইনের মতে, নিউটনের ধ্রুব সময়ের ধারণা ভুল। গতি এবং মহাকর্ষের প্রভাবে সময়কে ধীর করা বা সংকুচিত করা সম্ভব।"

২. মহাকর্ষ যখন সময়কে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়

আইনস্টাইনের 'জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি' আমাদের শেখায় যে মহাকর্ষ কেবল একটি বল নয়, এটি আসলে মহাবিশ্বের বুনট বা স্থান-কালকে (Space-time) বাঁকিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। একে বোঝার জন্য সোর্সে উল্লিখিত ‘বোলিং বল এবং রাবার শিট’-এর রূপকটি অত্যন্ত কার্যকর:

  • কল্পনা করুন একটি টানটান রাবার শিটের ওপর একটি ভারী বোলিং বল রাখা হয়েছে। বলটির ওজনে শিটটি একটি গর্তের মতো বেঁকে যাবে।
  • মহাবিশ্বে সূর্য বা ব্ল্যাক হোলের মতো ভারী বস্তুগুলো ঠিক এভাবেই তাদের চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়।
  • এই বাঁকানো বা মোচড়ানো স্থানে সময় ধীর হয়ে যায়। অর্থাৎ, মহাকর্ষের টান যেখানে যত বেশি, সময় সেখানে তত মন্থর।

সংক্ষেপে এই সম্পর্কটি দাঁড়ায়:

  • মহাকর্ষীয় বল যত শক্তিশালী হবে, সময় তত ধীর গতিতে চলবে।
  • পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি (যেখানে মহাকর্ষ প্রবল) সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় ধীর চলে; তাই পাহাড়ের চূড়ায় সময় সামান্য দ্রুত বয়ে যায়।
  • একটি ব্ল্যাক হোলের মতো প্রচণ্ড শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কাছাকাছি কয়েক ঘণ্টা সময় কাটানো পৃথিবীর কয়েক বছরের সমান হতে পারে।

৩. জন টাইটর এবং ইন্টারনেটের রহস্যময় 'সময় পরিব্রাজক'

তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার কঠিন আলোচনা থেকে যদি আমরা কিছুটা রহস্যের দিকে মোড় নিই, তবে ‘জন টাইটর’ (John Titor)-এর গল্পটি সবচেয়ে রোমাঞ্চকর। ২০০০ সালের দিকে ইন্টারনেটে জন টাইটর নামক এক ব্যক্তি নিজেকে ২০৩৬ সাল থেকে আসা একজন মার্কিন সেনা বলে দাবি করেন। তার অদ্ভুত মিশন ছিল ১৯৭৫ সালে ফিরে গিয়ে একটি ‘আইবিএম ৫১০০’ (IBM 5100) কম্পিউটার সংগ্রহ করা।

টাইটরের দাবি অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের কম্পিউটারগুলোতে এক ধরনের ভয়াবহ ‘বাগ’ দেখা দেবে (যা অনেকটা বাস্তব জীবনের ‘UNIX Year 2038 Problem’-এর মতো)। আইবিএম ৫১০০ মডেলে এমন এক গোপন ক্ষমতা (Emulation) ছিল যা মেইনফ্রেম কম্পিউটারের কোড অনুবাদ করতে সক্ষম, আর এটাই ছিল তার মিশন। টাইটর কিছু নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, যা মেলেনি এবং ২০০৯ সালের একটি তদন্তে উঠে আসে যে এটি সম্ভবত ল্যারি হ্যাবার নামক একজন আইনজীবীর তৈরি করা একটি বিনোদনমূলক চিত্রনাট্য বা ‘হোক্স’। তবুও, আইবিএম ৫১০০-এর সেই অপ্রকাশিত কারিগরি তথ্য একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা প্রায় অসম্ভব ছিল, যা এই রহস্যকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে।

৪. মহাবিশ্বের নিজস্ব 'সময়রক্ষা সংস্থা'

অতীতে ভ্রমণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ‘লজিক্যাল প্যারাডক্স’ বা যুক্তিগত অসংগতি। যেমন বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স’: আপনি অতীতে গিয়ে আপনার দাদাকে হত্যা করলে আপনার নিজেরই জন্ম হওয়ার কথা নয়, আর আপনার জন্ম না হলে অতীতে গিয়ে তাকে মারবে কে?

বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এই জট খুলতে ১৯৯২ সালে ‘Chronology Protection Conjecture’ ধারণাটি প্রস্তাব করেন। তার তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রকৃতিতে হয়তো এমন কোনো মেকানিজম বা ‘সময়রক্ষা সংস্থা’ আছে যা মহাবিশ্বকে এই অসংগতি থেকে রক্ষা করে। হকিং ব্যাখ্যা করেন, যখনই কোনো ওয়ার্মহোল বা শর্টকাট পথ একটি টাইম মেশিনে রূপান্তরিত হতে শুরু করবে, তখন সেখানে ‘কোয়ান্টাম এনার্জি ফ্লাকচুয়েশন’ বা এলোমেলো আলোক তরঙ্গের শক্তি এত তীব্র হয়ে উঠবে যে মুহূর্তেই সেই পথটি ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রকৃতি নিজেই লুপটিকে ভেঙে দেবে যাতে ইতিহাস অবিকৃত থাকে।

হকিংয়ের সেই অমর উক্তিটি ছিল:

"ইতিহাসবিদদের জন্য মহাবিশ্বকে নিরাপদ রাখাই প্রকৃতির লক্ষ্য।" (Making the universe safe for historians)

৫. আলোর ঘূর্ণন দিয়ে সময় মেশিন তৈরির স্বপ্ন

ডঃ রোনাল্ড ম্যালেট তার শৈশবের সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে আজ একজন প্রখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি তার বাবার অকাল মৃত্যু ঘোচানোর জন্য এক অভিনব গাণিতিক তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছেন। ম্যালেটের তত্ত্ব অনুযায়ী, লেজার রশ্নির একটি শক্তিশালী ঘূর্ণায়মান রিং (Ring Laser) মহাকাশ বা স্থানকে মোচড় দিয়ে একটি ‘টাইম লুপ’ তৈরি করতে পারে। একে বলা হয় ‘ফ্রেম ড্র্যাগিং’ (Frame Dragging)।

তবে ম্যালেট এখন মনে করেন, মানুষ হিসেবে অতীতে ফিরে যাওয়া হয়তো প্রায় অসম্ভব, কিন্তু তিনি লেজারের এই ঘূর্ণনকে ব্যবহার করে তথ্য বা বাইনারি কোড (Binary Code) অতীতে পাঠানোর চেষ্টা করছেন। তার মতে, যদি আমরা অতীতে একটি সতর্কবার্তা পাঠাতে পারি, তবে ইতিহাস বদলে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। এটি কেবল একটি জটিল গাণিতিক সমীকরণ নয়, বরং একজন ছেলের তার বাবাকে ফিরে পাওয়ার এক চিরন্তন আকুতি, যা পদার্থবিজ্ঞানের সীমানাকে মানবিক আবেগের সাথে গেঁথে দিয়েছে।

উপসংহার: ব্লক ইউনিভার্স এবং আমাদের আগামী

পদার্থবিজ্ঞানের একটি আধুনিক ও দার্শনিক চিন্তা হলো ‘ব্লক ইউনিভার্স’ (Block Universe) থিওরি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সময় বয়ে যায় না; বরং অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ মহাবিশ্বের এক বিশাল চতুর্মাত্রিক কাঠামোয় একসাথেই বিদ্যমান। সোর্স কনটেক্সটে উল্লেখিত সময়ের ‘অস্তিত্বের স্থায়িত্ব’ (Persistence of Existence) অনুযায়ী, আপনার শৈশব কোথাও হারিয়ে যায়নি, সেটি মহাবিশ্বের অন্য কোনো স্থানাঙ্কে এখনো বর্তমান। আমরা কেবল বর্তমানের স্লাইডটি অনুভব করছি।

সময় ভ্রমণ হয়তো বর্তমান প্রযুক্তিতে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ, কিন্তু আমাদের কল্পনা ও গণিতের শক্তি প্রতিদিন নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। সবশেষে আপনার কাছে একটি প্রশ্ন:

"যদি আপনি সত্যিই অতীতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেতেন, তবে কি আপনি নিজের জীবন বা ইতিহাসের কোনো বড় ঘটনা পরিবর্তনের ঝুঁকি নিতেন? নাকি সবকিছুকে তার আপন গতিতে চলতে দিতেন?"

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Don't forget to like, comment, share and subscribe to my Blog. Thank you.

ভূতের গল্প - গাছতলার মেয়েটি

  গাছতলার মেয়েটি আমার নাম নির্মল বসু। বয়স এখন সাতষট্টি। চাকরি করতাম স্কুলে, অঙ্ক পড়াতাম। এই গল্পটা যা বলব, তা আমার নিজের জীবনে ঘটা। কারও...